এসএমই নিয়ে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, বাস্তবতার দীর্ঘশ্বাস
বাংলাদেশে এমন কোনো অর্থনৈতিক সম্মেলন, ব্যাংকারদের সভা, বাজেট-পরবর্তী আলোচনা কিংবা বিনিয়োগবিষয়ক সেমিনার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে "এসএমই খাত অর্থনীতির মেরুদণ্ড", "তরুণ উদ্যোক্তারাই আগামীর বাংলাদেশ", অথবা "ব্যাংকের দরজা এসএমইর জন্য উন্মুক্ত"—এই কথাগুলো উচ্চারিত হয় না। কথাগুলো শুনতে ভালো লাগে। আশাবাদ জাগায়। কিন্তু একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যখন ঋণের আবেদন নিয়ে ব্যাংকের দরজায় দাঁড়ান, তখন তিনি যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন, তা অনেক ক্ষেত্রেই এসব ঘোষণার সঙ্গে মিল খুঁজে পায় না।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই। যাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি বলা হয়, বাস্তবে তারাই অর্থায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে।
একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যখন একটি ছোট কারখানা স্থাপন করতে চান, পাঁচ বা দশজন মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে চান, অথবা একটি নতুন উৎপাদন লাইন চালু করতে চান, তখন তাঁর প্রথম প্রয়োজন হয় ব্যাংকিং সহায়তা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই সহায়তার পরিবর্তে তিনি পান দীর্ঘ আবেদনপত্র, একের পর এক কাগজপত্রের তালিকা, অতিরিক্ত জামানতের দাবি, দীর্ঘসূত্রিতা এবং অনিশ্চয়তা। অনেকেই মাসের পর মাস অপেক্ষা করেন, বারবার ব্যাংকে যান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঋণের নিশ্চয়তা পান না। এই অভিজ্ঞতা অনেক উদ্যোক্তার কাছে নতুন নয়।
অন্যদিকে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা বলেন—"আমরা এসএমইকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।" প্রশ্ন হলো, যদি বাস্তবেই এসএমই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়, তাহলে এত উদ্যোক্তা কেন অর্থায়নের জন্য এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে ঘুরতে বাধ্য হন? কেন তাঁদের মধ্যে এত হতাশার জন্ম হয়? কেন বহু সম্ভাবনাময় উদ্যোগ প্রাথমিক মূলধনের অভাবে থেমে যায়?
এখানে সমস্যাটি শুধু একজন উদ্যোক্তার নয়, এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক সমস্যা। কারণ একটি ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান যখন গড়ে ওঠে না, তখন শুধু একজন ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হন না—কর্মসংস্থান কমে, উৎপাদন কমে, স্থানীয় বাজারে মূল্য সংযোজন কমে এবং রাষ্ট্র ভবিষ্যতের কর-রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হয়।
একটি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে কেবল বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী নয়। বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, জার্মানির Mittelstand, জাপানের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, দক্ষিণ কোরিয়ার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা চীনের উৎপাদনভিত্তিক ক্ষুদ্র কারখানাগুলোই বৃহৎ শিল্পায়নের ভিত গড়ে দিয়েছে। এসব দেশে এসএমইকে কেবল বক্তৃতায় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, সহজ অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহায়তা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিয়ে বাস্তবে শক্তিশালী করা হয়েছে।
বাংলাদেশেও এসএমই নিয়ে নীতি, প্রণোদনা ও পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ খাতের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন হলো—এই সুবিধাগুলো মাঠপর্যায়ে একজন নতুন উদ্যোক্তা কতটা সহজে পাচ্ছেন? নীতিগত ঘোষণা এবং বাস্তব প্রাপ্তির মধ্যে যদি বড় ব্যবধান থাকে, তাহলে সেই ব্যবধানই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
সব ব্যাংকের অভিজ্ঞতা এক নয়, এবং অনেক ব্যাংক এসএমই অর্থায়নে ইতিবাচক কাজও করছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে যদি উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ মনে করেন যে অর্থায়ন পাওয়া এখনও অত্যন্ত কঠিন, তাহলে সেই অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ অর্থনীতির স্বাস্থ্য বোঝা যায় কেবল নীতিপত্র দিয়ে নয়, বরং একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ব্যাংক থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর মুখের অভিব্যক্তি দেখে।
এসএমই নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত অর্থের অভাব নয়, সংকট হলো আস্থার। বক্তৃতায় আস্থা সৃষ্টি হয়, কিন্তু বাস্তবে সেই আস্থা টিকে থাকে ঋণ অনুমোদনের গতি, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং উদ্যোক্তার প্রতি সম্মানজনক আচরণের মাধ্যমে।
যেদিন একজন নতুন উদ্যোক্তা ব্যাংকের দরজায় গিয়ে নিজেকে অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, বরং সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে অনুভব করবেন—সেদিনই বলা যাবে, এসএমই সত্যিই জাতীয় অর্থনীতির অগ্রাধিকার পেয়েছে। তার আগে পর্যন্ত প্রতিশ্রুতির শব্দ যতই সুন্দর শোনাক, অনেক উদ্যোক্তার কাছে তা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি উচ্চকণ্ঠ, কিন্তু অনেক কম কার্যকর।
