চীন,মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কী বলে
উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সরকার, নাকি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রনীতি?
সংগৃহীত ছবি
একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কি দীর্ঘমেয়াদি সরকার অপরিহার্য, নাকি তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রনীতি? একটি গণতান্ত্রিক সরকার কি উন্নয়নের স্বার্থে কখনো কঠোর ও আপসহীন হতে পারে? আবার দীর্ঘদিন একই রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষমতায় থাকলেই কি উন্নয়ন নিশ্চিত হয়? চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, প্রশ্নটির উত্তর শুধু “গণতন্ত্র” অথবা “একনায়কতন্ত্র”—এই দুই শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়নের প্রকৃত পার্থক্য তৈরি হয় রাষ্ট্রের নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জবাবদিহি, দুর্নীতির মাত্রা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষমতার মধ্যে।
যে রাষ্ট্র পাঁচ বছর পরপর তার অর্থনৈতিক দর্শন, শিল্পনীতি, অবকাঠামো পরিকল্পনা, শিক্ষা, জ্বালানি, বৈদেশিক বিনিয়োগনীতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রাধিকার আমূল পাল্টে ফেলে, সেই রাষ্ট্রের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের গতি ধরে রাখা কঠিন। একটি বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে এক দশক লেগে যেতে পারে; দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে লাগে আরও বেশি সময়, বিদ্যুৎ, বন্দর, রেল, সড়ক ও নগর অবকাঠামোর ফল আসতে কখনো ১৫ থেকে ২০ বছরও লাগে। অথচ সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি রাষ্ট্রের লক্ষ্যও পরিবর্তিত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অর্থনৈতিক ফল পাওয়ার আগেই রাষ্ট্র নতুন পথে হাঁটা শুরু করে।
এখানেই দীর্ঘমেয়াদি সরকার ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রনীতির মৌলিক পার্থক্য। একটি সরকার ২০ বা ৩০ বছর ক্ষমতায় থেকেও দেশকে পিছিয়ে দিতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে চার বা আট বছর পরপর রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠান, আইন, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়, আর্থিক ব্যবস্থা, প্রযুক্তি এবং উৎপাদন কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে পারে।
উন্নয়নের সমীকরণ তাই কেবল ক্ষমতায় থাকার সময়ের ওপর দাঁড়ায় না। বরং বলা যায়—
Political Stability + Policy Continuity + Strong Institutions + Accountability + Low Corruption + Human Capital = Sustainable Development.
এই সমীকরণের একটি উপাদানকে বাদ দিয়ে আরেকটিকে অসীম ক্ষমতা দিলে উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
চীনের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ১৯৪৯ সালে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে Communist Party of China রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছে। রাজনৈতিক অর্থে এটি পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ ধারাবাহিক শাসনব্যবস্থা। মাও আধুনিক চীনা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করেন, ভূমি ও সামাজিক কাঠামো পাল্টান এবং কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ইতিহাস একই সঙ্গে বলে, Great Leap Forward এবং Cultural Revolution-এর মতো নীতিগুলো চীনের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য গভীর বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল।
তাই শুধু একই দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল বলেই চীনের উন্নয়ন হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত ইতিহাসসম্মত নয়। চীনের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় বাঁক আসে ১৯৭৮ সালের পর, দেং শিয়াওপিংয়ের Reform and Opening-up নীতির মাধ্যমে। কৃষি সংস্কার, Special Economic Zone, বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বাজারভিত্তিক প্রণোদনার সঙ্গে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রপরিকল্পনার সমন্বয় চীনকে নতুন পথে নিয়ে যায়।
বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংস্কার-পরবর্তী কয়েক দশকে চীনের অর্থনীতি গড়ে বছরে ৯ শতাংশেরও বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রায় ৮০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। এই ঘটনা মানব ইতিহাসের বৃহত্তম poverty-reduction achievements-এর একটি।
অর্থাৎ চীনের সাফল্যের মূল শিক্ষা হলো—রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে নীতিগত অভিযোজন থাকতে হবে। একই দল ক্ষমতায় থেকেছে, কিন্তু একই অর্থনৈতিক নীতিকে অন্ধভাবে ধরে রাখেনি। যেখানে পরিবর্তন দরকার হয়েছে সেখানে পরিবর্তন করেছে; যেখানে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হয়েছে সেখানে কঠোর হয়েছে, আর যেখানে বাজারকে সুযোগ দেওয়া দরকার হয়েছে, সেখানে বাজারকে জায়গা দিয়েছে।
মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা ভিন্ন, কিন্তু শিক্ষাটি কাছাকাছি। মাহাথির মোহাম্মদ ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা প্রায় ২২ বছর দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর শাসনব্যবস্থা ছিল শক্তিশালী executive leadership-নির্ভর এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। সমালোচকেরা সেই সময়ের মালয়েশিয়াকে কখনো dominant-party democracy, কখনো semi-authoritarian political system হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক ইতিহাসের বিচারে মাহাথির যুগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল policy consistency।
মালয়েশিয়া কৃষি ও commodity-নির্ভর অর্থনীতি থেকে manufacturing, electronics, services এবং global value chain-নির্ভর অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হয়। দীর্ঘমেয়াদি industrial policy, অবকাঠামো বিনিয়োগ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিক্ষার প্রসার এবং সরকারি প্রশাসনের তুলনামূলক দক্ষতা দেশটিকে এক প্রজন্মের মধ্যে একটি upper-middle-income economy-তে পরিণত করে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি সরকারকে উন্নয়নের স্বার্থে strong হতে হতে পারে; কিন্তু strong government ও arbitrary government এক নয়। রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে আইন বাস্তবায়নে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে, প্রকল্প বিলম্বের বিরুদ্ধে, অদক্ষতার বিরুদ্ধে, ট্যাক্স ফাঁকির বিরুদ্ধে এবং রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু ভিন্নমত দমন কিংবা আইনকে ব্যক্তির অধীন করে দেওয়া উন্নয়নমূলক কঠোরতা নয়।
এই আলোচনায় ভিয়েতনাম বাংলাদেশের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তুলনাগুলোর একটি। কারণ দুটি দেশই উন্নয়নশীল এশীয় অর্থনীতি, উভয়েরই বড় শ্রমশক্তি রয়েছে, রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর নির্ভরতা রয়েছে এবং তৈরি পোশাকসহ labor-intensive manufacturing-এ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু গত তিন দশকে ভিয়েতনাম যেভাবে electronics, machinery, mobile devices এবং diversified manufacturing-এর international supply chain-এ ঢুকে পড়েছে, বাংলাদেশ এখনো সেভাবে পারেনি।
এখানেই “১০০ টাকার উন্নয়ন” প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে Transparency International Bangladesh-এর LGED-সংক্রান্ত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পাওয়া এবং বিল ছাড় করানোর প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত commission দিতে হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে আসে। কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রায় ২০ শতাংশ এবং বিল পাওয়ার ক্ষেত্রে আরও প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশনের তথ্য সেখানে উল্লেখ ছিল। অর্থাৎ নির্দিষ্ট ওই প্রকল্প-পরিবেশে প্রতি ১০০ টাকার কাজের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩০ টাকার সমপরিমাণ commission burden-এর চিত্র পাওয়া গিয়েছিল।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
তবে এটিকে বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারি প্রকল্পে আজও ঠিক ৩০ শতাংশ দুর্নীতি হয়—এমন একটি জাতীয় গড় হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এটি নির্দিষ্ট খাত, নির্দিষ্ট সময় এবং নির্দিষ্ট গবেষণায় পাওয়া corruption exposure-এর চিত্র।
অন্যদিকে ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের Enterprise Survey 2009-এর microdata-তে একটি সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল—সরকারি contract পেতে একটি সাধারণ প্রতিষ্ঠান contract value-এর কত শতাংশ informal payment বা gift হিসেবে দেয়। উত্তরদাতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিষ্ঠান ৫ শতাংশ উল্লেখ করেছিল। ওই survey-এর valid responses-এর মধ্যে ৫ শতাংশ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ non-zero response।
সহজ ভাষায় বললে, এই তথ্য থেকে একটি বহুল আলোচিত তুলনামূলক চিত্র দাঁড় করানো যায়—
বাংলাদেশের কিছু উন্নয়ন প্রকল্পে প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে ৩০ টাকা পর্যন্ত commission-এর অভিযোগ গবেষণায় উঠে এসেছে, আর ভিয়েতনামের World Bank Enterprise Survey-এ সরকারি contract-এর ক্ষেত্রে ১০০ টাকায় ৫ টাকা informal payment উল্লেখকারী প্রতিষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পাওয়া গেছে।
এই তুলনার তাৎপর্য অসাধারণ।
তবে গবেষণাগত সততার জন্য এটিও পরিষ্কার করতে হবে—ভিয়েতনামের “৫ টাকা” দেশটির সব সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের national corruption rate নয়। একই survey-তে ০, ১, ২, ৩, ৪, ৬, ১০ এমনকি আরও বেশি শতাংশের উত্তরও রয়েছে; ফলে ৫ শতাংশকে পুরো ভিয়েতনামের সরকারি ব্যয়ের গড় দুর্নীতি বলা যাবে না। বিশ্বব্যাংকও এই microdata-র case count-কে population-level summary হিসেবে সরাসরি ব্যাখ্যা না করতে সতর্ক করেছে।
কিন্তু সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে ৩০ বনাম ৫ সংখ্যাটি আমাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ধারণা বুঝতে সাহায্য করে।
ধরা যাক, দুটি দেশেরই একটি সড়ক নির্মাণে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
প্রথম দেশে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন স্তরে commission, overpricing, collusion কিংবা অন্যান্য leakage মিলিয়ে ৩০ কোটি টাকা কার্যকর উন্নয়নের বাইরে চলে গেল। তাহলে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেও রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে ৭০ কোটি টাকার development value পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল।
দ্বিতীয় দেশে যদি একই ধরনের leakage মাত্র ৫ কোটি টাকার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেখানে ৯৫ কোটি টাকার কার্যকর development value অবশিষ্ট থাকে।
একই ১০০ টাকা।
কিন্তু এক রাষ্ট্র পাচ্ছে ৭০ টাকার কার্যকর মূল্য, অন্য রাষ্ট্র পাচ্ছে ৯৫ টাকার সম্ভাব্য মূল্য। ৭০ টাকার তুলনায় ৯৫ টাকা প্রায় ৩৫.৭ শতাংশ বেশি কার্যকর উন্নয়ন সক্ষমতা।
এক বছরের হিসাবে এটি হয়তো একটি সংখ্যা। কিন্তু ২০ বছর ধরে হাজার হাজার সড়ক, সেতু, হাসপাতাল, স্কুল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ, বন্দর এবং শিল্পাঞ্চলের ওপর এই ব্যবধান জমা হলে একটি দেশ অন্য দেশের তুলনায় কেন অনেক দ্রুত এগিয়ে যায়—তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা এখানে পাওয়া যায়।
তবে ভিয়েতনামকে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং OECD-এর বিশ্লেষণে World Bank Enterprise Survey-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে ভিয়েতনামের জরিপকৃত প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি কার্যক্রমে gifts বা informal payments-এর উপস্থিতি অনুভব করেছিল, এমনকি government contract পেতে gift দেওয়ার প্রত্যাশাও অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ছিল।
অর্থাৎ ভিয়েতনামের শিক্ষা “সেখানে দুর্নীতি নেই” নয়।
তাদের শিক্ষা হচ্ছে—দুর্নীতি থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের implementation machinery, industrial strategy এবং manufacturing ecosystem এতটা কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে যে অর্থনীতি দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিয়েতনামের “Blazing Furnace” anti-corruption campaign-এ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মন্ত্রী ও বড় ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দেশটির বৃহৎ আর্থিক দুর্নীতির মামলাগুলোও দেখিয়ে দিয়েছে যে ভিয়েতনামের governance system নিখুঁত নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান enforcement করার প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ institutional signal তৈরি করে।
বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি তাই শুধু “কত দুর্নীতি হয়” নয়, বরং দুর্নীতির পরিণতি কী?
কেউ যদি একটি সরকারি প্রকল্পে ১০ টাকা, ২০ টাকা কিংবা ৩০ টাকা অনিয়ম করে এবং তার রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক কোনো পরিণতি না হয়, তাহলে corruption একটি ব্যক্তিগত অপরাধ থেকে ধীরে ধীরে institutional business model-এ পরিণত হয়।
আর যদি রাষ্ট্র দেখাতে পারে—ক্ষমতা, দলীয় পরিচয় বা অর্থনৈতিক প্রভাব যাই থাকুক, প্রকল্পের টাকা অপচয়ের পরিণতি নিশ্চিত—তাহলে দুর্নীতির expected cost বেড়ে যায়।
এটাই enforcement economics।
Transparency International-এর ২০২৫ সালের Corruption Perceptions Index-ও বাংলাদেশের governance challenge কতটা গভীর, তার একটি তুলনামূলক চিত্র দেয়। ২০২৫ সালের CPI-তে বাংলাদেশ ২৪/১০০ স্কোর নিয়ে ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম অবস্থানে ছিল।
একই সূচকে মালয়েশিয়ার স্কোর ছিল ৫২ এবং অবস্থান ৫৪তম; চীনের স্কোর ৪৩ এবং অবস্থান ৭৬তম, যুক্তরাষ্ট্রের স্কোর ৬৪ এবং অবস্থান ২৯তম। Transparency International-এর ২০২৫ ফলাফলে ভিয়েতনামও বাংলাদেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো অবস্থানে ছিল।
এখানে আবার একটি ভুল যেন না হয়। CPI-তে বাংলাদেশ ২৪ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে দেশে ৭৬ শতাংশ অর্থ দুর্নীতি হয়। একইভাবে ৫২ স্কোর মানে মালয়েশিয়ায় ৪৮ শতাংশ দুর্নীতি হয় না। CPI হলো public-sector corruption সম্পর্কে experts ও businesspeople-এর perception-ভিত্তিক comparative indicator; এটি কোনো দেশের বাজেট থেকে কত শতাংশ টাকা চুরি হচ্ছে তার হিসাব নয়।
এই পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ আবার পুরো বিতর্কটিকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। সেখানে একজন প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে পারেন। Republican এবং Democratic Party পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসে। সরকার পরিবর্তিত হয়, প্রশাসনের অগ্রাধিকার বদলায়, এমনকি অনেক নীতিও বদলে যায়।
তারপরও দেশটির অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামো টিকে থাকে।
কারণ প্রেসিডেন্ট পরিবর্তিত হলেও Constitution পরিবর্তিত হয় না। একটি নির্বাচনে ক্ষমতা বদলালেই Harvard, MIT, NASA, Federal Reserve, capital market, patent system, judiciary কিংবা private property system ভেঙে পড়ে না। Apple, Microsoft, Boeing কিংবা হাজারো technology company-এর ব্যবসায়িক পরিকল্পনাও কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মেয়াদের সঙ্গে বাঁধা নয়।
এটাই continuity of institutions।
চীন দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার মাধ্যমে policy predictability তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে policy predictability তৈরি করেছে।
দুটি ব্যবস্থার রাজনৈতিক দর্শন সম্পূর্ণ আলাদা; কিন্তু উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন উপাদান রয়েছে—রাষ্ট্র ও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা সম্পর্কে পূর্বানুমানযোগ্যতা।
বাংলাদেশের মূল সংকট এখানেই।
আমরা দীর্ঘমেয়াদি সরকারও দেখেছি। স্বল্পমেয়াদি সরকারও দেখেছি। সামরিক শাসন দেখেছি। নির্বাচিত সরকার দেখেছি। দলীয় আধিপত্যের দীর্ঘ সময়ও দেখেছি।
কিন্তু এখনো কি আমরা এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে সরকার পরিবর্তিত হলেও ২০ বছরের শিল্পনীতি অপরিবর্তিত থাকবে?
একটি সরকার একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল শুরু করলে পরবর্তী সরকার সেটিকে একই গুরুত্বে শেষ করবে—এই নিশ্চয়তা কি রয়েছে?
শিক্ষানীতিতে কি ২০ বছরের consensus রয়েছে?
জ্বালানি নিরাপত্তায়?
রপ্তানি বহুমুখীকরণে?
নগর পরিকল্পনায়?
গবেষণা ও প্রযুক্তিতে?
কর ব্যবস্থায়?
বন্দর ও logistics-এ?
রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচন এবং procurement-এ?
এসব প্রশ্নের উত্তরই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণ করবে।
তাই “উন্নয়নের জন্য স্বৈরাচার দরকার”—এমন সরলীকৃত সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। বিশ্ব ইতিহাস তার পক্ষে সার্বজনীন প্রমাণ দেয় না। চীন ও ভিয়েতনাম কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, জাপান কিংবা নর্ডিক দেশগুলো গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে বিশ্বের উচ্চ উৎপাদনশীল ও উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
প্রকৃত কথা হলো—উন্নয়নের স্বার্থে সরকারকে decisive হতে হয়।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে decisive।
ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে decisive।
ট্যাক্স ফাঁকির বিরুদ্ধে decisive।
Tender manipulation-এর বিরুদ্ধে decisive।
প্রকল্পের অযৌক্তিক cost escalation-এর বিরুদ্ধে decisive।
মানহীন construction-এর বিরুদ্ধে decisive।
ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে decisive।
রাষ্ট্রের একটি ১০০ টাকার প্রকল্প থেকে যদি জনগণ ৭০ টাকার মূল্য পায়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নতুন ১০০ টাকা সংগ্রহ করা নয়—হারিয়ে যাওয়া ৩০ টাকা রক্ষা করা।
কারণ একটি দেশের জন্য corruption control শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; এটি সরাসরি development economics।
ধরা যাক, কোনো খাতে কার্যকর leakage ৩০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামানো গেল। তাহলে একই ১০০ টাকা বাজেট থেকে development value ৭০ টাকা থেকে বেড়ে ৯০ টাকায় দাঁড়াবে।
অর্থাৎ বাজেট এক টাকাও না বাড়িয়ে কার্যকর উন্নয়ন সম্পদ প্রায় ২৮.৬ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব।
আর যদি ৩০ টাকার leakage ৫ টাকার কাছাকাছি আনা যায়, তাহলে ৭০ টাকার পরিবর্তে ৯৫ টাকার উন্নয়ন সক্ষমতা পাওয়া সম্ভব—যা প্রায় ৩৫.৭ শতাংশ বেশি।
এটাই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক reform opportunity-গুলোর একটি।
আমাদের শুধু নতুন কর আরোপ, নতুন বৈদেশিক ঋণ কিংবা বড় উন্নয়ন বাজেটের আলোচনা করলে হবে না। প্রশ্ন করতে হবে—রাষ্ট্রের বিদ্যমান ১০০ টাকার কতটা আমরা রক্ষা করতে পারছি?
বাংলাদেশে e-Government Procurement, digital payment, open tender database, beneficial ownership disclosure, independent project audit, real-time expenditure tracking এবং performance-based public administration আরও শক্তিশালী করা গেলে একটি টাকার development multiplier বহুগুণ বাড়তে পারে।
কিন্তু প্রযুক্তি একা যথেষ্ট নয়।
Algorithm দুর্নীতিবাজকে শাস্তি দিতে পারে না।
আইন পারে। প্রতিষ্ঠান পারে। স্বাধীন audit পারে। সক্রিয় আদালত পারে। জবাবদিহিমূলক সংসদ পারে। মুক্ত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পারে। এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা পারে।
বাংলাদেশের তাই চীন হওয়ার দরকার নেই। মালয়েশিয়া হওয়ার দরকার নেই। ভিয়েতনামের carbon copy হওয়ারও প্রয়োজন নেই। যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামো হুবহু অনুকরণ করাও বাস্তবসম্মত নয়।
বাংলাদেশের দরকার নিজস্ব Developmental State Model।
যেখানে রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু জাতীয় অর্থনৈতিক লক্ষ্য পরিবর্তিত হবে না।
সরকার পরিবর্তিত হবে, কিন্তু শিক্ষা সংস্কার বন্ধ হবে না।
মন্ত্রী পরিবর্তিত হবেন, কিন্তু industrial policy উল্টে যাবে না।
প্রশাসনের কর্মকর্তা বদলাবেন, কিন্তু procurement transparency বন্ধ হবে না।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হবে, কিন্তু export diversification, energy security, infrastructure master plan, research policy এবং technological transformation একই গতিতে চলবে।
এর জন্য বাংলাদেশের অন্তত ২০ থেকে ২৫ বছরের National Development Consensus প্রয়োজন।
চীন আমাদের শেখায়—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী implementation একটি রাষ্ট্রকে অবিশ্বাস্য গতিতে পরিবর্তন করতে পারে।
মালয়েশিয়া শেখায়—দূরদর্শী নেতৃত্ব, industrialisation এবং policy continuity এক প্রজন্মের মধ্যে অর্থনীতির চরিত্র বদলে দিতে পারে।
ভিয়েতনাম শেখায়—manufacturing strategy, foreign investment, disciplined execution এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা একটি অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশকে global supply chain-এর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র শেখায়—একই ব্যক্তি কিংবা একই দলকে কয়েক দশক ক্ষমতায় না রেখেও প্রতিষ্ঠান, আইন, গবেষণা, innovation এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর শতবর্ষী ধারাবাহিকতা সম্ভব।
আর বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আমাদের সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি দেয়—
বাজেটের আকার উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি ১০০ টাকা শেষ পর্যন্ত কত টাকার জনকল্যাণ ও অর্থনৈতিক সম্পদ সৃষ্টি করছে, সেটিই প্রকৃত মাপকাঠি।
বাংলাদেশের কোনো কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে ১০০ টাকার বিপরীতে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা পর্যন্ত commission burden-এর চিত্র যদি গবেষণায় উঠে আসে, আর ভিয়েতনামের সরকারি contract-সংক্রান্ত World Bank survey-তে ৫ শতাংশ informal payment একটি উল্লেখযোগ্য উত্তর হিসেবে পাওয়া যায়, তবে সংখ্যাদুটি নিছক দুর্নীতির গল্প নয়—এগুলো রাষ্ট্রের Efficiency Gap বোঝার একটি শক্তিশালী প্রতীক।
প্রশ্ন তাই শুধু—
“একটি সরকার কত বছর ক্ষমতায় থাকবে?”
এটি নয়।
আরও বড় প্রশ্ন—
“যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রনীতি কত বছর অক্ষত থাকবে এবং রাষ্ট্রের প্রতি ১০০ টাকার কত টাকা শেষ পর্যন্ত জনগণের উন্নয়নে রূপান্তরিত হবে?”
একজন শক্তিশালী নেতা একটি দেশের যাত্রা শুরু করতে পারেন। একটি স্থিতিশীল সরকার সেই যাত্রার গতি বাড়াতে পারে। কিন্তু একটি জাতিকে কয়েক দশক ধরে উন্নয়নের পথে রাখতে পারে কেবল শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দীর্ঘমেয়াদি নীতি, দক্ষ প্রশাসন, আইনের শাসন, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং জনগণের প্রতিটি টাকার প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা।
ব্যক্তি চলে যান।
সরকার পরিবর্তিত হয়।
রাজনৈতিক যুগেরও সমাপ্তি ঘটে।
কিন্তু যে দেশে রাষ্ট্রনীতি টিকে থাকে, প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে এবং জনগণের ১০০ টাকার মূল্য রক্ষা করা হয়—সেই দেশের উন্নয়নও টিকে থাকে।
