খামারির ঘাড়ে লোকসান, ভোক্তার পকেটে টান-মুরগির ৫০ টাকার কারবার!
সংগৃহীত ছবি
ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। অথচ দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারিরা একই মুরগি বিক্রি করছেন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে। উৎপাদক পর্যায়ের দাম আর খুচরা বাজারের দামের মধ্যে ব্যবধান ৪০ থেকে ৫০ টাকা। এই বাড়তি টাকার কতটা পরিবহন ও বিপণন ব্যয়, আর কতটা মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীদের মুনাফা—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসানে পড়ছেন প্রান্তিক খামারিরা। বাচ্চা, খাবার, ওষুধ, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ মেটাতে গিয়ে অনেকের উৎপাদন খরচ কেজিতে ১৭০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে তার চেয়ে অনেক কম দামে। লোকসান সামলাতে না পেরে কেউ কেউ খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন।
১৭১ টাকা খরচ, বিক্রি ১৩০-১৪০ টাকায়
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার এক খামারি হিসাব অনুযায়ী, এক হাজার ব্রয়লার মুরগি ৩৫ দিন পালন করে বিক্রির উপযোগী করতে মোট খরচ হয় ৩ লাখ ৮ হাজার ৫০০ টাকা। রোগসহ বিভিন্ন কারণে ৪০ থেকে ৫০টি মুরগি মারা যাওয়ার পর গড়ে ৯৫০টি মুরগির প্রতিটির ওজন ১ দশমিক ৯ কেজি ধরলে উৎপাদন দাঁড়ায় ১ হাজার ৮০৫ কেজি। এতে প্রতি কেজি মুরগি উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ১৭১ টাকা।
এক হাজার বাচ্চা কিনতে তাঁর খরচ হয় ৫০ হাজার টাকা। ৫০ কেজির এক বস্তা খাবারের দাম ৩ হাজার ৯০০ টাকা। ৩৫ দিনে প্রয়োজন হয় ৫৫ বস্তা খাবার, যার মোট দাম ২ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ টাকা। ওষুধে ১৩ হাজার টাকা, লিটার তৈরিতে ৪ হাজার ৫০০ টাকা, শ্রমিকের মজুরিতে ১৫ হাজার টাকা, পরিবহনে ৫ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিলে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়।
এ অবস্থায় প্রতি কেজি মুরগি ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই উঠছে না। তারহিসাবে, প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ৩১ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার বদরপুর গ্রামের খামারি জাহাঙ্গীর হোসেনও একই সংকটে পড়েছেন। তিনি জানান, ডিলারদের কাছে সাধারণত প্রতি কেজি মুরগি ১৩০ থেকে ১৩২ টাকায় বিক্রি করেন। কখনো দাম ১৪০ টাকা পর্যন্ত পান।
বাজারে মন্দা ও গরমে মুরগি মারা যাওয়ায় তিন সপ্তাহ আগে মাইকিং করে ১৫০ টাকা কেজি দরে মুরগি বিক্রি করেছিলেন। তাতেও প্রায় ৪৯ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। তাঁর ওই ব্যাচে ৭০০টি মুরগি ছিল, যার মধ্যে ৭০ থেকে ৮০টি বড় মুরগি মারা যায়।
জাহাঙ্গীরের ভাষ্য, উৎপাদন খরচের তুলনায় প্রতি কেজিতে ২৫ টাকার বেশি লোকসান হয়েছে। শেষ পর্যন্ত খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
বাচ্চা-খাবারেই বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির পেছনে বাচ্চা ও খাবারের মূল্যবৃদ্ধি বড় কারণ হয়ে উঠেছে। গত ১৮ অক্টোবর ঢাকার কাপ্তান বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির ‘এ’ গ্রেডের বাচ্চা পাইকারিতে ৪৩ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ‘বি’ গ্রেডের বাচ্চার দাম ছিল ৩৩ থেকে ৩৮ টাকা। প্রান্তিক খামারিদের এসব বাচ্চা কিনতে পাইকারি দামের চেয়ে আরও ২ থেকে ৩ টাকা বেশি দিতে হয়।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এক খামারি চলতি মাসের শুরুতে প্যারাগনের ‘বি’ গ্রেডের এক হাজার বাচ্চা কিনেছিলেন প্রতিটি ৪০ টাকায়। অথচ গত মে মাসে একই মানের বাচ্চার দাম ছিল ২৬ টাকা। পাঁচ মাসে প্রতিটি বাচ্চার দাম বেড়েছে ১৪ টাকা।
খাবারের দামও ঊর্ধ্বমুখী। ঢাকার নিমতলী সিটি করপোরেশন মার্কেটে ৫০ কেজির এক বস্তা স্টার্টার ও গ্রোয়ার খাবারের পাইকারি দাম কোম্পানিভেদে ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু জিতু কর্মকার দুই সপ্তাহ আগে একই ধরনের খাবার কিনেছেন প্রতি বস্তা ৩ হাজার ৭২৫ টাকায়। গত ১৭ মে একই মানের খাবার কিনেছিলেন ৩ হাজার ৫০০ টাকায়।
কেরানীগঞ্জের বরিসুরের খাবার বিক্রেতা মফিজুল জানান, কয়েক মাসে প্রতি বস্তা মুরগির খাবারের দাম ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ভুট্টার দাম কেজিতে প্রায় ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৪০ টাকা হয়েছে। বাংলাদেশ ফিড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ারুল হক বলেন, সয়াবিন মিল ও ডিওআরবির দাম ২০ থেকে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কিছু খাদ্য উপকরণের দাম বেড়েছে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিও উৎপাদন এবং খাদ্য তৈরির খরচ বাড়িয়েছে।
১৩২ টাকার মুরগি ১৮০ টাকা, মাঝের ৪৮ টাকা কোথায়?
গত ১৬ অক্টোবরের বাজারচিত্রে দেখা যায়, খামারিদের কাছ থেকে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৩২ টাকায় কিনেছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। কারওয়ান বাজারের আড়তে তা বিক্রি হয়েছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়। এরপর পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা। খুচরা পর্যায়ে একই মুরগির দাম হয়েছে ১৮০ টাকা।
অর্থাৎ, ১৩২ টাকা থেকে ১৮০ টাকা—প্রতি কেজিতে দামের ব্যবধান ৪৮ টাকা।
কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের এক পাইকারি বিক্রেতা জানান, ওই দিন তিনি প্রতি কেজি মুরগি ১৬৫ টাকায় বিক্রি করেছেন। তাঁর মতে, তেলের দাম বাড়ার অজুহাতেও মুরগির দাম বেড়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন আগের মতো নেই।
কাপ্তান বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, তাঁরা খামার থেকে প্রতি কেজি মুরগি ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায় কেনেন। তবে পরিবহন খরচ এবং পথে মুরগির ওজন কমে যাওয়া ও মারা যাওয়ার কারণে দাম বাড়ে। ওই ব্যবসায়ীর দাবি, একটি পিকআপে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ কেজি মুরগি ঢাকায় আনতে প্রায় ১০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। খামার থেকে দুই হাজার কেজি মুরগি কাপ্তান বাজারে পৌঁছাতে প্রায় ১০০ কেজি ওজন কমে যায়। এ ছাড়া পথে কিছু মুরগি মারা যায়।
‘ফিডম্যান’ কারা, নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
বাজারের ব্যবসায়ীদের ভাষ্যে, কিছু প্রতিষ্ঠান খামারিদের বাচ্চা ও খাবার সরবরাহ করে এবং পরে উৎপাদিত মুরগি বিক্রির ব্যবস্থাও করে। এ ধরনের ব্যবস্থায় খামারিরা উৎপাদন করলেও বিক্রির ক্ষেত্রে তাঁদের স্বাধীনতা কতটা থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কাজী ফার্মস লিমিটেডের চুক্তিভিত্তিক খামারব্যবস্থায় প্রতি কেজি বিক্রিযোগ্য মুরগির বিপরীতে খামারির কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ টাকা ৫৭ পয়সা। ৩৫ দিনের মধ্যে কোম্পানি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডিলার বা পাইকারদের কাছে মুরগি বিক্রি করে। কুমিল্লা অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটির অধীনে প্রায় ১০০টি চুক্তিভিত্তিক খামার রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান মনে করেন, পোল্ট্রি খাতের অন্যতম সমস্যা করপোরেট গ্রুপগুলোর প্রভাব ও চুক্তিভিত্তিক খামারব্যবস্থা। তাঁর অভিযোগ, বাচ্চা ও খাবারসহ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বাজারে তাদের প্রভাব তৈরি হয়েছে।
এই অভিযোগের জবাবে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের চুক্তিভিত্তিক ব্রয়লার উৎপাদন এবং সামগ্রিক বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত। তাঁর দাবি, দেশের মোট পোল্ট্রি উৎপাদনের আনুমানিক ২০ শতাংশ আসে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের চুক্তিভিত্তিক খামার থেকে। বাকি বড় অংশ উৎপাদন করেন স্বাধীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা। তাই চুক্তিভিত্তিক খামারব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি নেই।
১৮০ টাকায় বিক্রি করেও স্বস্তি নেই
খুচরা বিক্রেতাদেরও দাবি, বাজারে দাম বেশি হলেও তাঁদের লাভের পরিমাণ সীমিত। কেরানীগঞ্জের জিনজিরা বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, ১৯৮১ সাল থেকে মুরগির ব্যবসা করছেন। তিনি জানান, বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মুরগি ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ১৭০ টাকা দরে কিনে ১৮০ টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি। দোকানভাড়া দিতে হয় না, তারপরও ব্যবসা পোষাচ্ছে না বলে তিনি জানান।
অর্থাৎ, উৎপাদক বলছেন লোকসানের কথা, খুচরা বিক্রেতার দাবি কম লাভের, আর ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। কিন্তু এই পুরো সরবরাহব্যবস্থায় কোন পর্যায়ে কত খরচ হচ্ছে এবং কত মুনাফা রাখা হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছ হিসাব সামনে নেই।
তদারকি কোথায়?
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের সহকারী পরিচালক ইন্দ্রানী রায় বলেন, অধিদপ্তর সরাসরি মূল্য নির্ধারণ করে না। বাজার তদারকির সময় বিক্রেতারা মূল্যতালিকা প্রদর্শন করছেন কি না, ক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ করছেন কি না এবং ক্রয়মূল্যের সঙ্গে পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় যোগ করে যৌক্তিক মুনাফা রাখছেন কি না, তা দেখা হয়। সরকার মূল্য নির্ধারণ করে দিলে তা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্যাব সভাপতি সফিকুজ্জামানের মতে, বাজার তদারকি জোরদার করা গেলে ভোক্তারা ১৫০ টাকার মধ্যেই ব্রয়লার মুরগি কিনতে পারতেন। তাঁর বক্তব্য, উৎপাদন খরচ, বিপণন ব্যয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের মুনাফা বিশ্লেষণ করে যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করতে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
ব্রয়লার মুরগির বাজারে তাই মূল প্রশ্ন শুধু দাম ১৮০ টাকা কেন, তা নয়। উৎপাদন ব্যয় কত, পরিবহন ও হাতবদলে প্রকৃত খরচ কত, কোন পর্যায়ে কত মুনাফা হচ্ছে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা কতটা কার্যকর—এসবের স্বচ্ছ হিসাব জরুরি। তা না হলে লোকসানে খামার বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি যেমন বাড়বে, তেমনি ভোক্তাকেও উচ্চমূল্যে মুরগি কিনতে হবে।
