সনদের পাহাড়ে বিবেকের দুর্ভিক্ষ
একটি জাতির সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য কি অর্থের অভাব, নাকি বিবেকের অভাব? প্রশ্নটি শুধু দার্শনিক নয়, গভীরভাবে অর্থনৈতিকও। কারণ একটি দেশে বিশ্ববিদ্যালয় বাড়তে পারে, উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে, অর্থনীতির আকার সম্প্রসারিত হতে পারে, অথচ একই সমাজে সততা, ন্যায়বোধ ও মানবিকতার সংকট গভীর হতে পারে। আমরা মানুষের যোগ্যতা পরিমাপ করি সনদ দিয়ে, সফলতা বিচার করি সম্পদ দিয়ে, আর উন্নয়ন মূল্যায়ন করি জিডিপি দিয়ে। কিন্তু অর্জিত জ্ঞান কতটা মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই হিসাব কোথায়?
আমরা কি সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি কেবল অর্থ উপার্জনে দক্ষ একটি প্রজন্ম গড়ে তুলছি?
অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকারের মানবসম্পদ তত্ত্ব অনুযায়ী, শিক্ষা মানুষের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু শিক্ষা সক্ষমতা বাড়ালেও সেই সক্ষমতার নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করে না। একজন দক্ষ হিসাববিদ আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারেন, আবার একই জ্ঞান ব্যবহার করে অনিয়ম আড়ালও করতে পারেন। একজন প্রকৌশলী নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারেন, আবার ব্যক্তিস্বার্থে নির্মাণের মান নিয়ে আপসও করতে পারেন। এখানেই জ্ঞান ও বিবেকের মৌলিক পার্থক্য। জ্ঞান মানুষকে ক্ষমতাবান করে, কিন্তু বিবেক নির্ধারণ করে সেই ক্ষমতা মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে, নাকি ক্ষতির কারণ হবে।
বিবেকের দুর্ভিক্ষেরও অর্থনৈতিক মূল্য আছে
দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ হলে ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করা যায়। কিন্তু সেই দুর্নীতির কারণে বিনিয়োগকারীর আস্থা কমে যাওয়া, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হওয়ার পূর্ণাঙ্গ হিসাব করা কঠিন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির আলোচনায় প্রতিষ্ঠান ও লেনদেন ব্যয়ের গুরুত্ব উঠে এসেছে। যেখানে পারস্পরিক বিশ্বাস দুর্বল, সেখানে প্রতিটি লেনদেনে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই, নজরদারি এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থ ব্যয় করতে হয়। অর্থাৎ অনৈতিকতা শুধু সামাজিক সংকট নয়, এটি অর্থনীতির ওপর এক ধরনের অদৃশ্য বোঝা। যে সমাজে বিবেকের ঘাটতি বাড়ে, সেখানে সৎভাবে বেঁচে থাকা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী, সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ছিল প্রায় ৭৪.৮ শতাংশ। কিন্তু সাক্ষরতার হার মানুষের সততা, নৈতিক সাহস কিংবা সামাজিক দায়িত্ববোধের পরিমাপক নয়। একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ যখন সচেতনভাবে আর্থিক প্রতারণা করেন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তখন তাঁর অর্জিত জ্ঞান সমাজের সুরক্ষার পরিবর্তে ক্ষতির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
অজ্ঞ মানুষ জ্ঞানের অভাবে ভুল করতে পারেন; কিন্তু শিক্ষিত মানুষ যখন সচেতনভাবে অন্যায় করেন, তখন সেই অন্যায়কে আড়াল করার কৌশলও তাঁর জানা থাকতে পারে। মেধা যখন উৎপাদনের বদলে সুবিধা আদায়ে ব্যবহৃত হয় । অর্থনীতিতে Rent-Seeking বলতে নতুন উৎপাদনশীল মূল্য সৃষ্টি না করে বিশেষ সুবিধা বা প্রভাবের মাধ্যমে অর্থনৈতিক লাভ অর্জনের প্রচেষ্টাকে বোঝায়।
যখন মেধাবী মানুষ উদ্ভাবন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিবর্তে ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে বিশেষ সুবিধা অর্জনকে বেশি লাভজনক মনে করেন, তখন অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একজন উদ্যোক্তা নতুন কারখানা স্থাপন করে শত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। অথচ অন্য কেউ অনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করলে প্রকৃত উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
ফলে দক্ষতার চেয়ে প্রভাব, পরিশ্রমের চেয়ে যোগাযোগ এবং উদ্ভাবনের চেয়ে বিশেষ সুবিধা অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়। এভাবেই বিবেকের সংকট অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
সম্পদের পাহাড় মানেই কি সমৃদ্ধ সমাজ?
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর Development as Freedom গ্রন্থে উন্নয়নকে শুধু আয়ের বৃদ্ধি নয়, মানুষের স্বাধীনতা, সক্ষমতা ও বাস্তব সুযোগ সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন।
একটি দেশের জিডিপি বাড়তে পারে, বহুতল ভবন নির্মিত হতে পারে, ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল যদি ন্যায়সংগতভাবে মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে উন্নয়নের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সম্পদ অর্জন অপরাধ নয়, ন্যায্য মুনাফা ও উদ্যোক্তার সাফল্য অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু প্রতারণা, দুর্নীতি কিংবা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে সম্পদ অর্জিত হলে তার সামাজিক মূল্য ভিন্ন।
যে সম্পদ একজনকে ধনী করতে গিয়ে অসংখ্য মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে, সেই সম্পদ ব্যক্তিগত হিসাবে লাভ হলেও সামাজিক হিসাবে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দুর্নীতির কারণে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্নমানের নির্মাণ কিংবা আর্থিক অনিয়মের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরও পড়ে। এই অদৃশ্য ব্যয়কে রূপক অর্থে বিবেকহীনতার অর্থনৈতিক মূল্য বলা যায়।
সনদের সমৃদ্ধি নয়, বিবেকের সমৃদ্ধি চাই
আমরা কতজন শিক্ষার্থী সনদ পেলেন, কত কোটি টাকা বিনিয়োগ হলো কিংবা অর্থনীতি কতটা বড় হলো—এসবের হিসাব রাখি। কিন্তু মানুষের মধ্যে বিশ্বাস কতটা বাড়ল, প্রতিষ্ঠান কতটা ন্যায়সংগত হলো কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সততার চর্চা কতটা প্রতিষ্ঠিত হলো—সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতির প্রকৃত শক্তি শুধু তার ব্যাংক, শিল্পকারখানা কিংবা দক্ষ জনশক্তিতে নয়, মানুষের সততা, পারস্পরিক আস্থা এবং ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানেও নিহিত।
আমাদের এমন শিক্ষা প্রয়োজন, যা মানুষকে শুধু অর্থ উপার্জনের কৌশল শেখাবে না, সেই অর্থ উপার্জনের ন্যায্য পথও দেখাবে। এমন অর্থনীতি প্রয়োজন, যেখানে মুনাফার পাশাপাশি মানবিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব গুরুত্ব পাবে। সনদ মানুষের পেশাগত পরিচয় দেয়, কিন্তু বিবেক তাকে মানবিক পরিচয় দেয়।
আমরা এমন সমাজ চাই না, যেখানে ব্যাংকে অর্থের প্রাচুর্য থাকবে কিন্তু মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদের পাহাড় থাকবে কিন্তু নৈতিক নেতৃত্বের সংকট থাকবে; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ সংকুচিত হবে। কারণ অর্থনীতির চূড়ান্ত উদ্দেশ্য শুধু সম্পদ সৃষ্টি নয়, মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
একটি জাতির সবচেয়ে ভয়াবহ দারিদ্র্য শুধু অর্থের অভাব নয়, বরং এমন এক সমাজ, যেখানে সম্পদ আছে কিন্তু ন্যায়বোধ নেই, জ্ঞান আছে কিন্তু সততা নেই, আর সনদ আছে কিন্তু বিবেক নেই। সেদিন জাতির মাথার ওপর থাকবে সনদের পাহাড়, অথচ তার অন্তরে নেমে আসবে বিবেকের দুর্ভিক্ষ। আর সেই দুর্ভিক্ষের মূল্য দিতে হবে সমগ্র জাতিকে।
মো. আনোয়ারুল ইসলাম
লেখক, কলামিস্ট ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
