সূর্যের শক্তি, বিদ্যুতের চাকা—বাংলাদেশের সবুজ অর্থনীতিতে বছরে সাশ্রয়ের সম্ভাবনা ২০-৩০ হাজার কোটি টাকা
মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম
বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত দুই দশকে দেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও সেই প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ নির্ভর করেছে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও কয়লার দামের অস্থিরতা বারবার বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, শিল্প উৎপাদন ব্যয় এবং বিদ্যুৎ খাতকে চাপে ফেলেছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহের মতো সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট শুধু একটি রাজস্ব পরিকল্পনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ও পরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের একটি নীতিগত রূপরেখা। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক যানবাহন (Electric Vehicle বা EV) খাতে সরকারের অগ্রাধিকার আগামী দশকের অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। অনেক অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই বাজেট বাংলাদেশের সবুজ অর্থনীতির নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে এলএনজি, কয়লা, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সৌরবিদ্যুৎকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান সৌরবিদ্যুতের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। বছরে প্রায় ৩০০ দিনের বেশি পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। দেশের কোটি কোটি বর্গফুট ছাদ, শিল্পকারখানার শেড, সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং কৃষি খাতের অব্যবহৃত স্থানকে যদি সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ বিনা জ্বালানি ব্যয়ে উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
বাজেট ২০২৫-২৬ এ পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে উৎসাহিত করার যে নীতিগত বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে রুফটপ সোলার, নেট মিটারিং, শিল্পখাতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার এবং বড় আকারের সৌর পার্ক নির্মাণ আরও গতি পাবে। এতে একদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে শিল্প উদ্যোক্তাদের বিদ্যুৎ ব্যয়ও হ্রাস পাবে।
তবে এই বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত সম্ভাবনার একটি হলো বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসার। বর্তমানে বাংলাদেশে পরিবহন খাত দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের অন্যতম বড় খাত। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন আমদানি করতে হয়, যার জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। পাশাপাশি যানবাহনের ধোঁয়া শহরাঞ্চলের বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে পেট্রোল ও ডিজেলচালিত যানবাহনের যুগ থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত বৈদ্যুতিক যানবাহনকে ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে সেই পথে এগোচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বৈদ্যুতিক গাড়ির পরিচালন ব্যয় একটি প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির তুলনায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। একই সঙ্গে এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
যদি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের মোট যানবাহনের প্রায় ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তরিত হয়, তাহলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি ব্যবহার তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা যায় যে বছরে প্রায় ১.৫ থেকে ২.০ বিলিয়ন লিটার সমপরিমাণ ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন সাশ্রয় হতে পারে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এর আর্থিক মূল্য কয়েক দশ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ হতে পারে। বিদ্যুৎ ব্যয় সমন্বয় করার পরও সম্ভাব্য নিট সাশ্রয় প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।
একইভাবে যদি দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করা যায়, তাহলে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের মূল্য এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে এতে বছরে প্রায় ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় হতে পারে।
অর্থাৎ, ২০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ এবং ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক যানবাহনের সমন্বয়ে বাংলাদেশ বছরে আনুমানিক ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করতে পারে। এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাবে, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করবে।
তবে অর্থনৈতিক লাভের চেয়েও বড় হতে পারে পরিবেশগত সুফল। আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড ও নির্গমন ফ্যাক্টরের ভিত্তিতে অনুমান করা যায়, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে এই রূপান্তর বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ১.৭ থেকে ২.২ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) নির্গমন কমানো সম্ভব হতে পারে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক অর্জন হবে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন। বর্তমানে Green Climate Fund (GCF), Global Environment Facility (GEF), Climate Investment Funds (CIF), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, UNDP এবং আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার জলবায়ুবান্ধব প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। যদিও UNDP সরাসরি কার্বন ক্রেডিট কিনে অর্থ প্রদান করে না, তবে তারা প্রকল্প প্রস্তুতি, কার্বন মার্কেটে প্রবেশ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল প্রাপ্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যদি বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১.৭ থেকে ২.২ কোটি টন CO₂ নির্গমন হ্রাসকে আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই ও নিবন্ধন করতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতি টন কার্বনের মূল্য যদি প্রায় ৫ মার্কিন ডলার হয়, তাহলে সম্ভাব্য বার্ষিক আয় হতে পারে প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৩০০ কোটি টাকা। প্রতি টন ১০ ডলার হলে সম্ভাব্য আয় ২,০০০ থেকে ২,৭০০ কোটি টাকা এবং ১৫ ডলার হলে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বনের মূল্য যদি ২৫ ডলারে উন্নীত হয়, তাহলে সম্ভাব্য বার্ষিক আয় ৫,০০০ থেকে ৬,৭০০ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ, সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার শুধু জ্বালানি আমদানি কমাবে না, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন “কার্বন অর্থনীতি” তৈরি করতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই রূপান্তর সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকার আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, কার্বন ক্রেডিট আয় এবং উন্নত প্রযুক্তিগত সহায়তা আকর্ষণ করার বাস্তব সুযোগ পেতে পারে।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, সৌরবিদ্যুৎ এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন একে অপরের পরিপূরক। দিনের বেলায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ করা যাবে। ভবিষ্যতে Vehicle-to-Grid (V2G) প্রযুক্তি চালু হলে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারিও বিদ্যুৎ গ্রিডের অংশ হিসেবে কাজ করতে পারবে। ফলে একটি স্মার্ট, পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
সুতরাং, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার একটি নতুন দিকনির্দেশনা। যদি ঘোষিত নীতিসমূহ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সবুজ অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক গাড়ির এই যুগল বিপ্লব বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে, নতুন শিল্প সৃষ্টি করবে, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান গড়ে তুলবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ উপহার দেবে। আজকের বাজেটে রোপিত এই বীজই হয়তো আগামী দিনের বাংলাদেশের সবুজ সমৃদ্ধির মহীরুহ হয়ে উঠবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬ ,Sustainable and Renewable Energy Development Authority (SREDA), Bangladesh, Bangladesh Power Development Board (BPDB) – বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদা সংক্রান্ত তথ্য, International Energy Agency (IEA) – Global EV Outlook. International Renewable Energy Agency (IRENA) – Renewable Energy Statistics. United Nations Development Programme (UNDP Bangladesh). Green Climate Fund (GCF). Global Environment Facility (GEF). Intergovernmental Panel on Climate Change (IPCC) Emission Factors. World Bank Climate and Development Reports. Asian Development Bank (ADB) Energy Transition Reports. Bangladesh Climate Change Strategy and Action Plan (BCCSAP). Bangladesh NDC 2021 Submission to UNFCCC. U.S. Environmental Protection Agency (EPA) – Greenhouse Gas Emission Factors. The Global Economy Database – Bangladesh Energy Consumption Statistics.
