গুলশানে ‘সমন্বয়ক’ পরিচয়ে সেই চাঁদাবাজি, পিবিআইয়ের তদন্তে আসামি ছয়জন
পুলিশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা, নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় দেওয়া, এরপর সেই পরিচয় ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে চাঁদাবাজি—এমনই এক অভিযোগের তদন্তে ছয়জনের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের গুলশানের বাসায় পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান চালানোর পর তার স্বামীকে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন অভিযুক্তদের দুইজন। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা আদায়ও করেন তারা।
ঘটনাটি ২০২৫ সালের জুলাই মাসের। বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে গিয়ে ওই মাসের ২৬ তারিখ পুলিশের হাতে আটক হন পাঁচজন। পরে গ্রেপ্তার হন আরও একজন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পিবিআই। তদন্তে চাঁদা দাবি, অর্থ আদায়, আসামিদের পারস্পরিক যোগাযোগ, টাকা ভাগাভাগি এবং আদায় করা অর্থে মোটরসাইকেল কেনার তথ্য উঠে এসেছে।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই ফিরোজ আহমেদ মুন্সী এসব তথ্য জানিয়েছেন। তার তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী পরিচয় দিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন। পরে সেই পরিচয় ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন।
মামলার বাদী সিদ্দিক আবু জাফর (৭৫)। তার স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদ। ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই তিনি গুলশান থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে গত ১৫ অক্টোবর ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন এসআই ফিরোজ আহমেদ মুন্সী।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ, জানে আলম অপু, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন ও আমিনুল ইসলাম। তাদের মধ্যে আমিনুল ইসলাম ঘটনার সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। তাঁর বিচার হবে শিশু আদালতে।
পিবিআইয়ের তদন্তে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসামিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। এ পরিচয়ের সুবাদে তাঁরা নিয়মিত থানায় যাতায়াত করতেন। আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার এবং তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশকে তথ্য দিয়ে যোগাযোগ বাড়ান।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের সঙ্গে এই যোগাযোগ ও সমন্বয়ক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে তাঁরা বিভিন্ন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের দোসর, সহযোগী বা সমর্থক আখ্যা দিয়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয় দেখাতেন। এর মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
তদন্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই রাতে সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদ গুলশানের বাসায় অবস্থান করছেন—এমন খবর পেয়ে কয়েকজন নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয়ে গুলশান-২ গোলচত্বরে জড়ো হন। পরে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু রাত আনুমানিক দুইটার দিকে গুলশান থানায় গিয়ে বিষয়টি জানান। শাম্মী আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানোর ব্যবস্থাও করতে বলেন তারা।
পরে গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে বিষয়টি জানায় থানা-পুলিশ। ১৭ জুলাই ভোরে গুলশান থানার এসআই আরমান আলীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল এবং আবদুর রাজ্জাক, জানে আলম অপুসহ কয়েকজন কথিত সমন্বয়ক শাম্মী আহমেদের বাসায় যান। সেখানে বিভিন্ন কক্ষে তাকে খোঁজাখুঁজি করা হয়। তবে তাঁকে পাওয়া যায়নি।
সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে তল্লাশির তালিকা তৈরি করে পুলিশ সদস্যরা বাসা থেকে বেরিয়ে যান। কিন্তু পুলিশ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আবার ওই বাসায় যান।
পিবিআইয়ের তদন্তে বলা হয়েছে, পুলিশ চলে যাওয়ার পর আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু সিদ্দিক আবু জাফরকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখান। গ্রেপ্তার এড়াতে তাঁর কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন তাঁরা। ভয়ভীতির মুখে সিদ্দিক আবু জাফর টাকা দিতে রাজি হন। তাৎক্ষণিকভাবে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার পর বাকি ৪০ লাখ টাকা প্রস্তুত রাখতে বলে চলে যান অভিযুক্তরা।
তদন্ত কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, টাকা নেওয়ার ভিডিও ফুটেজও তদন্তকারীরা পেয়েছেন। অর্থ আদায়ের পর অভিযুক্তরা ওই টাকা নিয়ে আবদুর রাজ্জাকের বাড্ডার বাসায় যান এবং নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ফিরোজ আহমেদ মুন্সী তদন্তের বরাতা দিয়ে জানান, ১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আবার ওই বাসায় যান। দরজায় ধাক্কাধাক্কি করলেও কেউ দরজা না খোলায় তারা চলে যান। পরে কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে ওই সময় তাদের ঘটনাস্থলে থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
এরপর ২৬ জুলাই বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে আবার ওই বাসার সামনে যান অভিযুক্তরা। তখন বাসায় ছিলেন না বাদী সিদ্দিক আবু জাফর। নিরাপত্তাকর্মী মো. হান্নান ফোনে তাঁকে বিষয়টি জানান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি গুলশান থানায় খবর দেন।
পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আবদুর রাজ্জাক, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন ও কিশোর আমিনুল ইসলামকে আটক করে। জানে আলম অপু পালিয়ে গেলেও পরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয়ের তদন্তে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার ছয়জনের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁদের জবানবন্দিতে টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র, সবাই জামিনে
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফিরোজ আহমেদ মুন্সী অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন, আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপুর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩৮৫ ও ৩৮৬ ধারার অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও ইব্রাহিম হোসেনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮ ও ৩৮৫ ধারার অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিশোর আসামির বিচার শিশু আদালতে হবে।
তিনি বলেন, মামলার ছয় আসামিই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। আগামী ১০ নভেম্বর অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি হবে আদালতে।
