ফুটবলে হলুদ-লাল কার্ডের দিন কি ফুরোচ্ছে!
সংগৃহীত ছবি
ফুটবল মাঠে রেফারির পকেট থেকে হলুদ কিংবা লাল কার্ড বের করে দেখানোর দৃশ্যটি খেলাটির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো খেলোয়াড়কে সতর্ক করা কিংবা মাঠ থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানাতে এই দুই রঙের কার্ডই যথেষ্ট। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের যুগে ফুটবলের সেই চিরচেনা দৃশ্যেও এবার লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। কাগজের কার্ডের বদলে রেফারির হাতে উঠে এসেছে ফোনের মতো দেখতে একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র!
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়ের ঘরোয়া ফুটবল প্রতিযোগিতায় পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এই ডিজিটাল কার্ড। মাঠে খেলোয়াড়কে সতর্ক করার পাশাপাশি ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে নথিবদ্ধ করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তবে নতুন এই প্রযুক্তি কি একদিন ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী হলুদ ও লাল কার্ডের জায়গা পুরোপুরি দখল করবে? সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
কার্ডের বদলে হাতে ডিজিটাল যন্ত্র
গত বৃহস্পতিবার উরুগুয়ের কোপা উরুগুয়ে প্রতিযোগিতায় রেন্তিস্তাসের বিপক্ষে নাসিওনালের ম্যাচে দেখা যায় ব্যতিক্রমী এই দৃশ্য। খেলোয়াড়কে সতর্ক করতে প্রচলিত হলুদ কার্ডের বদলে ফোনের আকারের একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র তুলে ধরেন রেফারি এদুয়ার্দো ভারেইয়া।
কার্ড দেখানোর এই অভিনব পদ্ধতি মূলত একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে ফুটবলের দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার চেষ্টা চলছে। তবে এটি এখনই প্রচলিত হলুদ ও লাল কার্ডের আনুষ্ঠানিক বিকল্প নয়।
প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে REFe নামের একটি উদ্যোগ। এর পরিচালক মাউরো সাকো উরুগুয়ের রেডিও ‘এল এস্পেকতাদোর দেপোর্তেস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ফুটবলের যে অংশটি এখনো অ্যানালগ পদ্ধতিতে চলছে, সেখানে প্রযুক্তি যুক্ত করাই তাঁদের লক্ষ্য।
হাতে লেখা থেকে সরাসরি ডিজিটাল নথি
ফুটবল মাঠে কোনো খেলোয়াড়কে হলুদ কিংবা লাল কার্ড দেখানোর পর রেফারিকে সাধারণত ম্যাচের ঘটনা, খেলোয়াড়ের পরিচয় ও শাস্তির বিবরণ লিখে রাখতে হয়। পরে এসব তথ্য আনুষ্ঠানিক নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াও রয়েছে। ফলে মাঠের উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত সামলানোর পাশাপাশি রেফারিদের প্রশাসনিক কাজও করতে হয়।
এই প্রক্রিয়াকে সহজ করার ভাবনা থেকেই ডিজিটাল কার্ডের ধারণা।
তিন বছরেরও বেশি সময় আগে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন মাউরো সাকো ও তাঁর সহপরিচালক দিয়েগো দে লা পেনা। বৃষ্টির মধ্যে একটি ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে—প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগেও কেন রেফারিদের হাতে লিখে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে?
সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় নতুন যন্ত্রটির পরিকল্পনা।
ডিজিটাল যন্ত্রটি ম্যাচের ঘটনাগুলো সময়ের উল্লেখসহ সংরক্ষণ করতে পারে। এর ফলে সতর্কতা কিংবা বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান্তের তথ্য দ্রুত নথিবদ্ধ করা সম্ভব হবে। ডেভেলপারদের লক্ষ্য, উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ‘COMET’ প্ল্যাটফর্মে ম্যাচের আনুষ্ঠানিক তথ্য জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করা।
অর্থাৎ, মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা লিখে রাখা এবং পরে ডিজিটাল ব্যবস্থায় স্থানান্তরের বাড়তি কাজ কমিয়ে আনতে পারে এই প্রযুক্তি।
সুবিধা আছে, আছে দৃশ্যমানতার সংকটও
পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পর নতুন যন্ত্রটি নিয়ে আশাবাদী রেফারি এদুয়ার্দো ভারেইয়া। তাঁর মতে, যন্ত্রটি হাতে ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন তিনি। এর সফটওয়্যারও দ্রুত সাড়া দিয়েছে।
তবে প্রচলিত কার্ড দেখানোর মতো নাটকীয়তা এতে কিছুটা কম বলে স্বীকার করেছেন তিনি। ফুটবলে রেফারির হাত থেকে হলুদ কিংবা লাল কার্ড উঁচিয়ে ধরার দৃশ্যটি খেলোয়াড়, দর্শক ও টেলিভিশন দর্শকদের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্তের বার্তা পৌঁছে দেয়। নতুন যন্ত্রে সেই পরিচিত দৃশ্যের আবেগ ও স্পষ্টতা ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
আর প্রথম দিকের পরীক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সমস্যাটি সামনে এসেছে, সেটি হলো পর্দার দৃশ্যমানতা।
এর আগে সূর্যের আলোয় পর্দা দেখতে অসুবিধা হওয়ায় একটি পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছিল। এবারের ম্যাচেও গ্যালারিতে থাকা দর্শক ও টেলিভিশনে খেলা দেখা দর্শকদের কেউ কেউ রেফারির সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে বুঝতে সমস্যায় পড়েন।
দিয়েগো দে লা পেনা অবশ্য বিষয়টিকে প্রকল্পের উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, সরাসরি মাঠে যন্ত্রটি দেখার অভিজ্ঞতা টেলিভিশনে দেখার চেয়ে ভালো ছিল। এখন দর্শকদের কাছে সিদ্ধান্তগুলো আরও স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
ডেভেলপাররা এ জন্য যন্ত্রটির চারপাশে এলইডি আলো যুক্ত করাসহ বিভিন্ন পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। তাঁদের লক্ষ্য, হলুদ কার্ডের ক্ষেত্রে হলুদ এবং লাল কার্ডের ক্ষেত্রে লাল রং যেন মাঠে উপস্থিত দর্শক থেকে শুরু করে টেলিভিশনের পর্দায় থাকা দর্শক—সবার কাছে স্পষ্ট হয়।
ঐতিহ্য বনাম প্রযুক্তি
ফুটবল শুধু নিয়ম, গোল কিংবা জয়-পরাজয়ের খেলা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, আবেগ ও পরিচিত কিছু দৃশ্য। রেফারির হলুদ কার্ড দেখানো কিংবা লাল কার্ড তুলে খেলোয়াড়কে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার মুহূর্তও সেই ঐতিহ্যের অংশ।
তাই ডিজিটাল কার্ডের মতো উদ্ভাবনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ একে সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, কেউ আবার ফুটবলের চেনা সৌন্দর্য হারানোর আশঙ্কা করছেন।
তবে সমালোচনা কিংবা উপহাসকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন না সাকো। তাঁর মতে, নতুন কোনো উদ্ভাবন নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের অভ্যস্ত হতেও সময় লাগে।
প্রকল্পটির নাম নিবন্ধন এবং হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের পেটেন্ট নেওয়ার কাজও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন এর ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা দূর করে আরও কার্যকর করে তোলার দিকে নজর দিচ্ছেন তাঁরা।
ফিফার স্বীকৃতি কি মিলবে?
ডিজিটাল কার্ডের উদ্ভাবকেরা আশা করছেন, প্রযুক্তিটি আরও উন্নত হলে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এবং বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হবে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
প্রযুক্তিটি সফল হলে রেফারিদের প্রশাসনিক কাজ সহজ হওয়ার পাশাপাশি ম্যাচের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের তথ্য সংরক্ষণেও গতি আসতে পারে। একই সঙ্গে দর্শকদের কাছে কার্ডের সংকেত আরও স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল কার্ড ফুটবলের প্রচলিত হলুদ ও লাল কার্ডকে সরিয়ে দেবে, নাকি কেবল রেফারিদের কাজের সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবেই ব্যবহৃত হবে—তা নির্ভর করছে পরীক্ষার ফলাফল, ব্যবহারিক সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট ফুটবল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।
ফুটবলের মাঠে প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্য নতুন নয়। কিন্তু এই উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো, খেলাটির সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর একটিকেই নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। আগামী দিনে রেফারির হাতে কাগজের কার্ডের বদলে ডিজিটাল পর্দা দেখা গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, মাঠে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং দর্শকের কাছে তার স্পষ্টতা নিশ্চিত করাই হবে এই উদ্ভাবনের প্রকৃত সাফল্য।
