পরিবার বদলেছে, বদলায়নি আপনজনের প্রয়োজন
সংগৃহীত
একসময় একই ছাদের নিচে থাকত দাদা-দাদি, বাবা-মা, চাচা-ফুফু, ভাই-বোনসহ পরিবারের বহু মানুষ। সুখ-দুঃখ, উৎসব-অনুষ্ঠান কিংবা বিপদ সবকিছুই ভাগাভাগি করে নেওয়ার সেই যৌথ পরিবার ছিল বাঙালির সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণা। শহুরে ব্যস্ততা, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন, আবাসনসংকট এবং পারিবারিক নানা টানাপোড়েনে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে সংসার। বাড়ছে একক পরিবার, কমছে একসঙ্গে থাকার অভ্যাস। ফলে শুধু একটি পরিবার নয়, বদলে যাচ্ছে প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সম্পর্কের ধরনও। কেন ভাঙছে যৌথ পরিবার, কী হারাচ্ছে সমাজ এবং এই পরিবর্তনের ভবিষ্যৎই বা কোথায়, তা নিয়ে দ্য নিউজের তিন পর্বের বিশেষ আয়োজন। আজ প্রকাশিত হচ্ছে শেষ পর্ব।
একটা সময় ছিল, বাড়ির দরজা সন্ধ্যার পর বন্ধ হলেও ভেতরে জীবন থামত না। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ, উঠানে শিশুরা খেলত, বারান্দায় বসে গল্প করতেন পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা। কেউ বাজার থেকে ফিরছেন, কেউ অফিস থেকে, কেউ বা পাশের বাড়ি থেকে গল্প করে আসছেন। এখন সেই বাড়ির অনেক দরজাই হয়তো বন্ধ। কেউ ঢাকায়, কেউ চট্টগ্রামে, কেউ বিদেশে। একই পরিবারের মানুষ, কিন্তু ঠিকানা আলাদা। যোগাযোগ আছে, ভালোবাসাও আছে; শুধু একসঙ্গে থাকার অভ্যাসটা নেই।
বাস্তবতা বলছে, আগের সেই বড় যৌথ পরিবারে ফিরে যাওয়া সহজ নয়। মানুষের জীবন এখন অনেক বেশি গতিশীল। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, শহুরে জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা সবকিছুই মানুষকে নিজের মতো করে জীবন সাজাতে শিখিয়েছে।
তবে এর মানে এই নয় যে মানুষ পরিবারকে আর চায় না। বরং মানুষ এখনো চায় আপনজনকে কাছে রাখতে। শুধু সেই কাছাকাছি থাকার ধরনটা বদলে যাচ্ছে।
একই বাড়িতে না থেকেও অনেকে বাবা-মায়ের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। কেউ একই এলাকার মধ্যে আলাদা বাসা নিয়েছেন, কেউ একই ভবনে থাকছেন। কেউ প্রতিদিন ফোন করছেন, নিয়মিত দেখা করতে যাচ্ছেন। আবার ছুটির দিন কিংবা উৎসবের সময় সবাই এক জায়গায় মিলিত হচ্ছেন। অর্থাৎ, যৌথ পরিবার হয়তো ভাঙছে, কিন্তু যৌথতার প্রয়োজন এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো বাবা-মাকে ঘিরেই। যে বাবা-মা সারাজীবন সন্তানদের বড় করেছেন, বয়স হলে তাদের প্রয়োজন হয় সময়, সঙ্গ আর নিরাপত্তার। সন্তান দূরে থাকলে অর্থের অভাব হয়তো থাকে না, কিন্তু অভাব হয় পাশে বসে কথা বলার মানুষের। একটি ফোন অনেক দূরত্ব কমাতে পারে, কিন্তু সব দূরত্ব মুছে দিতে পারে না।
বৃদ্ধ বাবা হয়তো ফোনে ছেলেকে বলেন, ‘ভালো আছিস তো?’
ছেলেও জিজ্ঞেস করে, ‘তোমরা ঠিক আছ তো?’ দুজনেই জানেন, তারা ভালো নেই। কিন্তু কেউ সেটা মুখে বলেন না।
কারণ দূরে থাকা সন্তানটিরও সংসার আছে, দায়িত্ব আছে। আর বাবা-মায়েরও আছে বয়সের বাস্তবতা। এই জায়গাটিই ভবিষ্যতের পরিবার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আজকের তরুণরা যখন নিজেদের সংসার গড়ছেন, তারাও জানেন একদিন তাদের বয়স হবে। তাদের সন্তানরাও হয়তো চাকরি বা জীবিকার প্রয়োজনে দূরে চলে যাবে। তখন আজকের সিদ্ধান্তগুলোই হয়তো নতুন করে সামনে দাঁড়াবে। তাই ভবিষ্যতের পরিবার হয়তো পুরোপুরি যৌথ হবে না, আবার পুরোপুরি বিচ্ছিন্নও হবে না। তৈরি হতে পারে মাঝামাঝি একটি কাঠামো যেখানে আলাদা সংসার থাকবে, কিন্তু সম্পর্ক থাকবে কাছাকাছি। একই এলাকায় কয়েকটি পরিবারের বাসা। কাছেই বাবা-মা। প্রয়োজন হলে কয়েক মিনিটেই একে অন্যের কাছে পৌঁছানো যায়। সন্তান নিজের মতো করে সংসার করবে, আবার বৃদ্ধ বাবা-মায়েরও দেখাশোনা হবে। এটি হয়তো পুরোনো যৌথ পরিবারের হুবহু ফিরে আসা নয়। কিন্তু যৌথতার একটি নতুন রূপ হতে পারে।
আসলে যৌথ পরিবার টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় উপায় হয়তো সবাইকে একই ছাদের নিচে রাখা নয়। প্রয়োজন একে অন্যের জায়গাটাকে বোঝা। বয়স্কদের বুঝতে হবে, নতুন প্রজন্ম আগের মতো জীবনযাপন করতে চায় না। আবার নতুন প্রজন্মকেও বুঝতে হবে, স্বাধীনতার অর্থ বাবা-মাকে একা করে দেওয়া নয়।
আলাদা থাকা অপরাধ নয়। নিজের মতো করে সংসার করাও ভুল নয়। ভুল তখনই, যখন আলাদা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ববোধও আলাদা হয়ে যায়। একটি পরিবারে হয়তো রান্নাঘর আলাদা হতে পারে, ঘর আলাদা হতে পারে, এমনকি শহরও আলাদা হতে পারে। কিন্তু অসুস্থতার খবর শুনে যদি ছুটে যাওয়া যায়, বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো যায়, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের হাতটা ধরে বলা যায়—‘আমি আছি’—তাহলে পরিবারটি পুরোপুরি ভেঙে যায় না।
কারণ পরিবার আসলে দেয়াল দিয়ে তৈরি নয়।
ফিরে আসবে কি যৌথ পরিবারের দিন?
হয়তো আগের মতো ১৫-২০ জন মানুষ একসঙ্গে একই বাড়িতে থাকবে না। হয়তো দাদা-দাদির পাশে নাতি-নাতনিদের প্রতিদিনের বেড়ে ওঠাও আগের মতো হবে না।
কিন্তু মানুষ চাইলে হারিয়ে যাওয়া কিছু অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে পারে।
মাসে একদিন সবাই একসঙ্গে খেতে বসা যায়। ঈদে সবাই বাড়িতে জড়ো হওয়া যায়। সন্তানদের দাদা-দাদির কাছে নিয়ে যাওয়া যায়। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে শুধু টাকা নয়, সময়ও ভাগ করে নেওয়া যায়। কারণ আধুনিক জীবন আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে—স্বাধীনতা দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে, নিজের পরিচয় তৈরি করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু তার বিনিময়ে যেন আমরা আপন মানুষগুলোর জন্য সময়টুকু হারিয়ে না ফেলি।
হয়তো ভবিষ্যতের পরিবারে সবাই একই ছাদের নিচে থাকবে না। কেউ থাকবে ঢাকায়, কেউ অন্য শহরে, কেউ বিদেশে। তবু যদি সম্পর্কের দরজাটা খোলা থাকে, তাহলে পরিবার বেঁচে থাকবে। কারণ সময় বদলায়। বাড়ি বদলায়। ঠিকানা বদলায়। মানুষের জীবন বদলায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ ফিরে আসতে চায় সেই জায়গাতেই, যেখানে তাকে কেউ নিঃশর্তভাবে আপন বলে ডাকে। একদিন যে উঠানে ২০ জন মানুষের কোলাহল ছিল, সেখানে হয়তো এখন নীরবতা। তবু সেই উঠানের গল্প শেষ হয়ে যায়নি। শুধু গল্পের চরিত্রগুলো বদলে গেছে।
যৌথ পরিবার হয়তো আগের রূপে আর ফিরবে না। কিন্তু পরিবারকে ধরে রাখার দায়িত্বটা এখন আমাদেরই এক ছাদের নিচে নয়, অন্তত একে অন্যের হৃদয়ের ভেতর।
