হৃদয়ের যত রেকর্ড
সমালোচনার জবাব দিলেন ব্যাটে, ভেঙে দিলেন মুশফিকের রেকর্ড; বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে নতুন উচ্চতায় তাওহিদ হৃদয়
অন্য প্রান্তে একের পর এক সতীর্থের বিদায়। উইকেটের পতন থামছিল না, কিন্তু নিজের প্রান্তে অবিচল তাওহিদ হৃদয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা নানা কৌশলে চেষ্টা করেও তাঁকে থামাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ২৪২ রানে অপরাজিত থেকেই মাঠ ছাড়েন বাংলাদেশের এই ব্যাটসম্যান। তাঁর ব্যাটে শুধু একটি ডাবল সেঞ্চুরি নয়, রচিত হয়েছে রেকর্ডের পর রেকর্ড।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৩৫৯ বলের ম্যারাথন ইনিংসটি সাজান ২২টি চার ও ১১টি ছক্কায়। বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩৮৬ রান। এর মধ্যে হৃদয়ের একার অবদান ২৪২—দলের মোট রানের ৬২ শতাংশেরও বেশি।
আগের টেস্টে দুই ইনিংসেই বাজে শট খেলে আউট হওয়ার পর সমালোচনায় বিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। এবার সেই সমালোচনার জবাব দিলেন ব্যাট হাতে। ক্যারিয়ারের মাত্র তৃতীয় টেস্টেই নিজের প্রথম সেঞ্চুরিকে নিয়ে গেলেন ডাবল সেঞ্চুরির ঘরে। পাশাপাশি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে নিজের নাম লিখলেন একাধিক নতুন রেকর্ডের পাশে।
নতুন চূড়ায় হৃদয়
বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ড এখন হৃদয়ের দখলে। ২৪২ রানের অপরাজিত ইনিংসে ছাড়িয়ে গেছেন মুশফিকুর রহিমকে। ২০১৮ সালে মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২১৯ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন মুশফিক। প্রায় আট বছর পর সেই রেকর্ড নতুন করে লিখলেন হৃদয়।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ড আগে থেকেই তাঁর দখলে। গত আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ৩৫০ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। এবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বড় মঞ্চেও নিজের সামর্থ্যের নতুন প্রমাণ দিলেন।
প্রথম সেঞ্চুরিতেই ডাবল আনন্দ ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্টের পঞ্চম ইনিংসে প্রথম সেঞ্চুরি। আর সেই সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিলেন হৃদয়। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে দ্বিশতক করা চতুর্থ ব্যাটসম্যান তিনি। এর আগে এই কীর্তি গড়েছেন মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান। মুশফিকের রয়েছে তিনটি ডাবল সেঞ্চুরি।
তবে হৃদয়ের কীর্তি আরও বিশেষ। বাংলাদেশের হয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে পরিণত করা প্রথম ব্যাটসম্যান তিনি। এত দিন এই তালিকায় সর্বোচ্চ ছিল মুমিনুল হকের ১৮১ রান। ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিতে ওই রান করেছিলেন তিনি।
বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসেও হৃদয়ের এই কীর্তি বিরল। প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া ৪৫তম ব্যাটসম্যান তিনি। প্রথম সেঞ্চুরিতে তাঁর চেয়ে বেশি রান করতে পেরেছেন মাত্র ১১ জন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও প্রথম
ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের ডাবল সেঞ্চুরি ছিল না। সেই অপেক্ষারও অবসান ঘটালেন হৃদয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান এখন তিনি।
এর আগে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস ছিল মাহমুদউল্লাহর। ২০১৮ সালে মিরপুর টেস্টে ১৩৬ রান করেছিলেন তিনি। হৃদয়ের ২৪২ রানে সেই রেকর্ডও এখন পেছনে।
ছক্কার রাজা, বিশ্বরেকর্ডের খুব কাছে হৃদয়ের ইনিংসে ছিল রক্ষণ আর আক্রমণের দারুণ ভারসাম্য। সুযোগ পেলেই বোলারদের ওপর চড়াও হয়েছেন। ১১টি ছক্কা হাঁকিয়ে বাংলাদেশের হয়ে এক টেস্ট ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড গড়েছেন তিনি।
এর আগে এই রেকর্ড ছিল তামিম ইকবালের দখলে। ২০১৫ সালে খুলনায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০৬ রানের ইনিংসে সাতটি ছক্কা মেরেছিলেন তামিম।
বিশ্বরেকর্ডটাও নাগালে পেয়ে গিয়েছিলেন হৃদয়। আর একটি ছক্কা মারতে পারলেই এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ১২ ছক্কার রেকর্ডে ভাগ বসাতে পারতেন ওয়াসিম আকরাম ও যশস্বী জয়সওয়ালের সঙ্গে। কিন্তু তাসকিন আহমেদ আউট হওয়ায় বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হয়ে যায়। ১১ ছক্কা নিয়েই থামতে হয় তাঁকে। টেস্টে এক ইনিংসে ১১টি করে ছক্কা আছে হৃদয়সহ সাত ব্যাটসম্যানের।
এক দিনে সর্বোচ্চ রান
দিনের খেলা শুরু করেছিলেন ২৯ রানে অপরাজিত থেকে। এরপর এক দিনেই যোগ করেন ২১৩ রান। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে এক দিনে কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ রান এটি।
২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২১৭ রানের ইনিংস খেলার পথে এক দিনে ২১২ রান করেছিলেন সাকিব আল হাসান। হৃদয় এক রান বেশি করে সাকিবের সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেলেন।
দলের ইনিংসে একার অবদান ৬২ শতাংশ
বাংলাদেশের ৩৮৬ রানের ইনিংসে হৃদয়ের অবদান ২৪২। অর্থাৎ দলের মোট সংগ্রহের ৬২.৬৯ শতাংশই এসেছে তাঁর ব্যাট থেকে। টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দলের ইনিংসে এটিই সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত অবদান।
এর আগে এই রেকর্ড ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের সিমুর নার্সের। ১৯৬৯ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৫৮ রান করার পথে দলের ৪১৭ রানের মধ্যে ৬১.৮৪ শতাংশ রান করেছিলেন তিনি।
পূর্ণাঙ্গ টেস্ট ইনিংসে দলের মোট রানের তুলনায় ব্যক্তিগত অবদানের হিসাবে হৃদয়ের চেয়ে এগিয়ে আছেন মাত্র সাতজন ব্যাটসম্যান।
বাউন্ডারিতেই ১৫৪ রান
৩৫৯ বলের ইনিংসে হৃদয়ের ২২টি চার ও ১১টি ছক্কা মিলিয়ে বাউন্ডারি থেকে এসেছে ১৫৪ রান। বাংলাদেশের হয়ে এক টেস্ট ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড এটিই।
এর আগে ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২১৭ রানের ইনিংসে ৩১টি চার মেরে বাউন্ডারি থেকে ১২৪ রান করেছিলেন সাকিব আল হাসান।
সিলেটের মাঠেও নতুন ইতিহাস
২০১৮ সালে টেস্ট অভিষেকের পর সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে কোনো ব্যাটসম্যানের ডাবল সেঞ্চুরি ছিল না। হৃদয়ের হাত ধরে সেই অপেক্ষার অবসান হলো।
এই মাঠে আগের ছয় টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস ছিল মাহমুদুল হাসান জয়ের। গত বছর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ১৭১ রান করেছিলেন তিনি। হৃদয়ের ২৪২ রানে সিলেটের টেস্ট ইতিহাসেও যুক্ত হলো নতুন মাইলফলক।
জুটিতে একের পর এক কীর্তি
ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি সতীর্থদের নিয়ে গড়া জুটিতেও ইতিহাস লিখেছেন হৃদয়। বাংলাদেশের ইনিংস যখন ১৮৪ রানে সাত উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল, তখন তাইজুল ইসলামকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়েন তিনি। অষ্টম উইকেটে দুজনের ১১৭ রানের জুটি সিলেটের মাঠে এই উইকেটে প্রথম শতরানের জুটি।
বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে অষ্টম উইকেটে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি। শীর্ষে রয়েছে মুশফিকুর রহিম ও মেহেদী হাসান মিরাজের ১৪৪ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওই জুটি গড়েছিলেন তাঁরা। এ ছাড়া ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মুশফিক ও নাঈম ইসলামের ১১৩ রানের জুটিও রয়েছে এই তালিকায়।
তাইজুল বিদায় নেওয়ার পর তাসকিন আহমেদকে নিয়ে আরও ৮৫ রান যোগ করেন হৃদয়। সিলেটের মাঠে নবম উইকেটে এটিই সর্বোচ্চ জুটি। এর আগে গত মে মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে লিটন কুমার দাস ও শরিফুল ইসলাম নবম উইকেটে ৬৪ রান যোগ করেছিলেন।
শেষ দিকে সতীর্থদের নিয়ে হৃদয়ের এই লড়াইয়ের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে দলের মোট সংগ্রহে। ১৮৪ রানে সপ্তম উইকেট হারানোর পর শেষ তিন উইকেটে আরও ২০২ রান যোগ করে বাংলাদেশ। টেস্টে শেষ তিন উইকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান এটি। ২০২১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ তিন উইকেটে ১৯৮ রান করেছিল দলটি।
এক ইনিংসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান, প্রথম সেঞ্চুরিতেই ডাবল সেঞ্চুরি, এক দিনে সর্বোচ্চ রান, সর্বাধিক ছক্কা, বাউন্ডারি থেকে সর্বোচ্চ সংগ্রহ—কী নেই হৃদয়ের এই ইনিংসে! সতীর্থরা একে একে ফিরে গেলেও তিনি ছিলেন অবিচল। ২৪২ রানের অপরাজিত ইনিংস তাই কেবল একটি ডাবল সেঞ্চুরি নয়; বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে এক ব্যাটসম্যানের একক আধিপত্য ও অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের অনন্য দলিল।
