মাঠে প্রতিপক্ষের গোলরক্ষকের আঘাতে ফুটবলারের মৃত্যু, হত্যার তদন্তে স্পেনের পুলিশ
সংগৃহীত ছবি
ফুটবল মাঠে প্রতিপক্ষ দলের গোলরক্ষকের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব তেনেরিফের ৩০ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড হেসুস দে মিগেল। এ ঘটনায় গোলরক্ষক হেসুস ওউনোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করছে স্পেনের পুলিশ। ঘটনাটি ঘিরে ফুটবল বিশ্বে শোকের পাশাপাশি তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
গত সোমবার ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে বল দখলের লড়াইয়ে এফসি আন্দররার গোলরক্ষক ওউনো দ্রুত এগিয়ে এসে দে মিগেলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তার হাঁটু দে মিগেলের বুক ও মাথায় আঘাত করে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনার পরপরই রেফারি ওউনোকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান।
মঙ্গলবার তেনেরিফ ক্লাব জানায়, সংঘর্ষের পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন দে মিগেল। তার বয়স হয়েছিল ৩০ বছর। স্পেনের জাতীয় পুলিশ জানিয়েছে, অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মৃত্যুর ঘটনা হওয়ায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সংঘর্ষের ধরন, গোলরক্ষকের ভূমিকা এবং ঘটনাটি নিছক খেলার অংশ ছিল, নাকি গুরুতর অবহেলার কারণে ঘটেছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গোলরক্ষকের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা হতে পারে
স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী, খেলার সময় সহিংস আচরণের কারণে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় গুরুতর আহত হলে চার থেকে ১২ ম্যাচ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে। তবে দে মিগেলের মৃত্যুর ঘটনায় গোলরক্ষকের শাস্তি নির্ধারণের আগে সংঘর্ষের প্রকৃতি ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে।
অন্যদিকে স্পেনের দণ্ডবিধির ১৪২ ধারায় অবহেলাজনিত হত্যার বিষয়ে বিধান রয়েছে। গুরুতর অবহেলার কারণে নরহত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। কম গুরুতর অবহেলার ক্ষেত্রে তিন থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
তবে মাঠের স্বাভাবিক খেলায় সংঘটিত কোনো সংঘর্ষের জন্য ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করা সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে গোলরক্ষকের আচরণ ফৌজদারি অবহেলার পর্যায়ে পড়ে কি না, সেটিই হবে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সান্তা ক্রুস দে তেনেরিফের প্রধান প্রসিকিউটর হোসে লুইস সানচেজ-হাওরেগি স্প্যানিশ সংবাদ সংস্থা ইএফইকে জানিয়েছেন, সংঘর্ষটি খেলার সময় ঘটেছে বলে ফৌজদারি মামলা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা
ঘটনার পর গোলরক্ষক ওউনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। অনেকে তাকে ফুটবল থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করা এবং ফৌজদারি অভিযোগ আনার দাবি জানিয়েছেন। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় অপমানজনক মন্তব্য ও বর্ণবাদী গালিগালাজও করা হয়েছে। একপর্যায়ে তার প্রায় ৩০ হাজার অনুসারীর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
তবে সংঘর্ষের পর ওউনোর আচরণ নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রথমে তিনি আহত দে মিগেলের দিকে না তাকিয়ে মাঠ ছাড়ার দিকে এগিয়ে যান। লাল কার্ড দেখানোর পর চিকিৎসাকর্মীরা মাঠে এলে তিনি ফিরে এসে সতীর্থদের সঙ্গে দে মিগেলের পাশে দাঁড়ান। পরে ক্লাব কর্মকর্তারা তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে যান।
ফুটবল বিশ্বে শোক
দে মিগেলের মৃত্যুতে তেনেরিফ ক্লাব, এফসি আন্দররা, স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন ও লা লিগাসহ বিভিন্ন ক্লাব শোক প্রকাশ করেছে। সাবেক বার্সেলোনা তারকা ও আন্দররার মালিক জেরার্দ পিকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকবার্তা দিয়েছেন।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কয়েকটি ম্যাচসহ ইউরোপের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে দে মিগেলের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়েছে। বার্সেলোনা, আতলেতিকো মাদ্রিদ ও ভিয়ারেয়ালের ম্যাচ শুরুর আগে প্রতিযোগিতার প্রচলিত সংগীতও বাজানো হয়নি।
মাদ্রিদে জন্ম নেওয়া দে মিগেল ২০১৫ সালে লেগানেসের দ্বিতীয় দলের হয়ে পেশাদার ফুটবলে যাত্রা শুরু করেন। পরে স্পেনের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন। গত বছর যোগ দেন তেনেরিফেতে। স্ত্রী ও এক কন্যাসন্তান রেখে গেছেন তিনি।
ক্লাব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিবারের অনুরোধে তার মরদেহ তলেদো প্রদেশের নাভাহেরমোসায় নেওয়া হবে। আগামী শনিবার ক্লাবের মাঠে সমর্থকেরা তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন। ফুটবল মাঠে এমন প্রাণঘাতী সংঘর্ষ বিরল হলেও এর আগেও স্পেনে ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে একই ধরনের দুর্ঘটনায় খেলোয়াড়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
ফলে দে মিগেলের মৃত্যু শুধু একটি ক্লাবের শোক নয়, বরং মাঠে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও সংঘর্ষের ঘটনায় দায় নির্ধারণের প্রশ্নটিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
