বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের আগে আর্জেন্টিনা দলে কী ঘটেছিল, জানালেন লাউতারো
সংগৃহীত ছবি
২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পথে আর্জেন্টিনা দলের ভেতরে কাজ করেছিল বিশেষ আবেগ। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধ ম্যাচটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল বলে জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার লাউতারো মার্তিনেজ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করার পর এবার সেই ম্যাচ ঘিরে দলের অনুভূতির কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
১৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালে পিছিয়ে পড়েও ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৯২ মিনিটে লিওনেল মেসির বাড়ানো ক্রস থেকে গোল করে দলকে জয় এনে দেন ইন্টার মিলানের এই স্ট্রাইকার। এই জয়ের মধ্য দিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।
তবে লাউতারোর কাছে গোলটি কেবল একটি ম্যাচ জেতানোর মুহূর্ত ছিল না। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের আর্জেন্টাইন সৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গোলটি তাঁদের উৎসর্গ করেন তিনি। আর্জেন্টিনায় দ্বীপপুঞ্জটি মালভিনাস নামে পরিচিত। দেশটির ইতিহাসে এই যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
এএফএ স্টুডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লাউতারো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁকে এমন একটি ভিডিও দেখানো হয়, যেখানে তাঁর গোল উদ্যাপন করতে গিয়ে ফকল্যান্ড যুদ্ধের এক সৈনিককে কাঁদতে দেখা যায়।
লাউতারো বলেন, যুদ্ধের সময় দেশের জন্য সৈনিকেরা যেভাবে লড়াই করেছেন, তাঁদের সেই অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই গোলটি উৎসর্গ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, জাতীয় দলের সঙ্গে সেই সৈনিকদের আবেগের সংযোগ তৈরি হওয়া আর্জেন্টিনা দল সাম্প্রতিক সময়ে যা অর্জন করেছে, তারই প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, দল যে পুরস্কার, স্বীকৃতি ও প্রশংসা পাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে পূর্বসূরিদের সংগ্রামের শিক্ষা। কীভাবে লড়াই করতে হয়, তা তাঁদের কাছ থেকেই শেখা।
ম্যাচের আগে অবশ্য বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি আলোচনা করতে চাননি আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি চেয়েছিলেন, খেলাটি যেন যুদ্ধের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে আলোচিত না হয়। তবে লাউতারোর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, দলের ভেতরে ম্যাচটির আবেগ ছিল অন্যরকম।
লাউতারোর ভাষ্য, ক্যামেরার সামনে খেলোয়াড়দের ফুটবলেই মনোযোগ দিতে হয়েছে। কিন্তু দলের ভেতরে ম্যাচটি আর দশটি খেলার মতো ছিল না। দুই দেশের দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই লড়াই ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, ফকল্যান্ড ইস্যু খেলোয়াড়দের বাড়তি শক্তি ও উদ্দীপনা জুগিয়েছিল।
১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ৭৪ দিনব্যাপী যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে ৬৫৫ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। প্রাণ হারান তিনজন দ্বীপবাসীও। ওই বছরের জুনে ব্রিটিশ বাহিনী দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে। তবে দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে দুই দেশের বিরোধ এখনো অমীমাংসিত।
ইংল্যান্ডকে হারানোর পরও ম্যাচ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক থামেনি। উদ্যাপনের সময় আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও জিওভানি লো চেলসো গ্যালারির সামনে একটি ব্যানার তুলে ধরেন। তাতে লেখা ছিল, ‘লাস মালভিনাস সন আর্হেন্তিনাস’, যার অর্থ ‘ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার’। ব্যানারটি কোথা থেকে এসেছে, তা স্পষ্ট নয়। এ ঘটনায় ফিফা তদন্ত শুরু করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্টেডিয়ামে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শন সংস্থাটির নিয়মের পরিপন্থী হতে পারে।
নিজের গোলের তাৎপর্যও তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি লাউতারো। ম্যাচের পর দেশে ফিরে সমর্থকদের সঙ্গে দেখা করার পর তিনি এর গভীরতা বুঝতে পারেন। তাঁর কথায়, গোলটির জন্য মানুষ যখন তাঁকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিল, তখনই উপলব্ধি করেন এটি দেশের মানুষের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারেনি আর্জেন্টিনা। ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয় লিওনেল মেসির দল। লাউতারোর মতে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন সেমিফাইনাল দলকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দিয়েছিল। তবে ফাইনালে খেলোয়াড়েরা নিজেদের সর্বোচ্চটা দেননি, এমন ধারণা মানতে নারাজ তিনি।
লাউতারো জানান, সেমিফাইনালের ধকলের পরও ফাইনালে খেলোয়াড়েরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছেন। কয়েকজনকে চোট বা শারীরিক সমস্যার কারণে মাঠ ছাড়তে হলেও অন্যরা নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, প্রতিপক্ষ স্পেন ছিল শক্তিশালী দল এবং ম্যাচের শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনারও সুযোগ ছিল।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ১৫ জুলাইকে জাতীয় ফুটবল দিবস ঘোষণা করেছে। দিনটি ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো মারাদোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ ও একক প্রচেষ্টায় করা গোলের স্মৃতিও ফিরিয়ে আনে।
পুরো বিশ্বকাপ অভিযানকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন লাউতারো। তাঁর মতে, সমর্থকদের সঙ্গে দলের দৃঢ় সংযোগই ছিল পথচলার অন্যতম শক্তি। তিনি আর্জেন্টিনা দলকে এমন একটি দল হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যারা সহজে হাল ছাড়ে না এবং সব সময় আরও ভালো করার চেষ্টা করে। পাশাপাশি লিওনেল মেসির নেতৃত্বও খেলোয়াড়দের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে বলে মনে করেন এই স্ট্রাইকার।
