বাচ্চাদের আদর করে চুমু দেওয়া যাবে? ইসলাম কী বলে
সংগৃহীত ছবি
শিশুদের আদর করা, বুকে জড়িয়ে ধরা এবং কপালে চুমু দেওয়া মানুষের স্বাভাবিক স্নেহের প্রকাশ। ইসলামও শিশুদের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও মমতা প্রদর্শনকে উৎসাহিত করেছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ ﷺ নিজেও শিশুদের আদর করতেন এবং চুমু দিতেন। তবে শিশুকে আদর করার ক্ষেত্রে শালীনতা, ব্যক্তিগত সীমারেখা ও নিরাপত্তা রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে শিশুদের চুমু দেওয়া সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?
শিশুদের চুমু দিতেন মহানবী
শিশুদের আদর করার বিষয়ে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো রাসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর জীবনাচরণ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার নাতি হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে চুমু দিলেন। সে সময় আকরা ইবনে হাবিস নামের এক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আমার দশটি সন্তান আছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই কখনো চুমু দিইনি।’
তখন রাসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ
অর্থ: ‘যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না।’-সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭।
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, শিশুদের চুমু দেওয়া ও স্নেহ প্রকাশ করা ইসলামে বৈধ। বরং সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা ও মমতা প্রকাশ করা নবীজি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহসম্মত আচরণের অন্তর্ভুক্ত।
চুমু না দেওয়াকে নিরুৎসাহিত করেছেন নবীজি
আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার কয়েকজন বেদুইন রাসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা কি শিশুদের চুমু দেন?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তারা বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমরা তো শিশুদের চুমু দিই না।’
তখন রাসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তর থেকে দয়া উঠিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমি কী করতে পারি?’-সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩১৭।
এ হাদিসে শিশুদের প্রতি স্নেহ-মমতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। সন্তানকে আদর করা, বুকে জড়িয়ে ধরা ও চুমু দেওয়া শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি শিশুর সঙ্গে ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলারও একটি মাধ্যম।
কুরআনে শিশুদের প্রতি মমতার শিক্ষা
পবিত্র কুরআনে শিশুদের চুমু দেওয়ার বিষয়ে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশ নেই। তবে আল্লাহ তাআলা দয়া, উত্তম আচরণ ও মানুষের প্রতি অনুগ্রহের শিক্ষা দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন: وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا
অর্থ: ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’-সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ৮৩।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ
অর্থ: ‘আর মুমিনদের প্রতি তোমার বাহু অবনত করো (বিনয় ও কোমলতা প্রদর্শন করো)।’-সুরা আল-হিজর, আয়াত: ৮৮। আয়াত দুটি যথাক্রমে উত্তম আচরণ ও কোমলতার শিক্ষা দেয়। শিশুদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শনের সরাসরি দলিল হিসেবে হাদিস আরও সুস্পষ্ট।
অন্যের শিশুকে চুমু দেওয়ার বিধান কী?
নিজের সন্তান, নাতি-নাতনি কিংবা আপনজনদের শিশুকে আদর করে কপাল বা মাথায় চুমু দেওয়া সাধারণভাবে জায়েজ। অন্যের শিশুকেও আদর করা নীতিগতভাবে নিষিদ্ধ নয়। তবে এখানে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
প্রথমত, শিশুটির অভিভাবকের অনুমতি ও স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিশুটি নিজে অস্বস্তি বোধ করলে তাকে জোর করে চুমু দেওয়া বা কোলে নেওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক, বয়স, পরিবেশ এবং ইসলামের শালীনতার বিধান বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিশেষ করে বালেগ হওয়ার কাছাকাছি বা বালেগ শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে মাহরাম ও গায়রে মাহরামের বিধান, পর্দা এবং শারীরিক স্পর্শের সীমারেখা রক্ষা করা প্রয়োজন। গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে কামনা-বাসনাসংশ্লিষ্ট বা যৌন প্রকৃতির স্পর্শ কোনোভাবেই সাধারণ স্নেহের নামে বৈধ হয়ে যায় না।
আদরের নামে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ কি জায়েজ?
না। শিশুকে চুমু দেওয়া জায়েজ হওয়ার অর্থ এই নয় যে, যেকোনো ব্যক্তি যেকোনোভাবে শিশুকে স্পর্শ করতে পারবেন। আদর ও যৌন নিপীড়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
শিশুর সংবেদনশীল অঙ্গ স্পর্শ করা, যৌন উদ্দেশ্যে কাছে টানা, অস্বস্তিকরভাবে জড়িয়ে ধরা কিংবা শিশুর আপত্তি উপেক্ষা করে শারীরিক সংস্পর্শ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিশুটি ছোট বলে তার অনুভূতি, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
একইভাবে, কোনো শিশুকে চুমু দেওয়ার ঘটনা দেখেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌন নিপীড়নের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। আবার শিশুর অভিযোগকে হালকাভাবে নেওয়াও অনুচিত। অভিযোগ উঠলে শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে রেখে, ভয় দেখানো বা প্রভাবিত না করে, প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের সহায়তায় বিষয়টি যাচাই করতে হবে।
শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা জরুরি
শিশুদের আদর করার সময় অভিভাবক, শিক্ষক ও অন্য প্রাপ্তবয়স্কদের দায়িত্ব হলো তাদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত সীমারেখার প্রতি সম্মান দেখানো। শিশুকে বোঝাতে হবে, তার শরীর তার নিজের এবং কোনো স্পর্শে অস্বস্তি হলে সে ‘না’ বলতে পারে। শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং অভিযোগ জানালে তাকে দোষারোপ না করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে বলা যায়, শিশুদের আদর করে চুমু দেওয়া ইসলামে জায়েজ এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। তবে এই বৈধতা স্নেহ, মমতা ও শালীনতার সীমার মধ্যে। শিশুর সম্মতি ও স্বাচ্ছন্দ্য, অভিভাবকের দায়িত্ব, বয়সোপযোগী সীমারেখা এবং নিরাপত্তা রক্ষা করা অপরিহার্য। ইসলামের শিক্ষা হলো—শিশুকে ভালোবাসতে হবে, তার প্রতি দয়া করতে হবে এবং যেকোনো ধরনের অনিষ্ট থেকে তাকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
