বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা জাতির জন্য অভিশাপ
বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ, এমতাবস্থায় ২০২৪ সালে এসে ছাত্রসমাজ বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা মেনে নিতে নারাজ। মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭২ সাল থেকে কোটা পদ্ধতি চালু হয় যাতে ৫৬ শতাংশ কোটা এবং ৪৪ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে চাকরি দেওয়া হতো। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে চাকরি প্রত্যাশী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা "বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ" -এর নেতৃত্বে সাধারণ বিক্ষোভ এবং মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে । প্রবল আন্দোলনের মুখে সরকার ৯ম থেকে ১৩ তম গ্রেডে(১ম ও ২য় শ্রেণীর ) সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল করেন।
২০২৪ সালে এসে পুনরায় ৩০% মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং অন্যান্য সহ মোট ৫৬% কোটা চালু করা হয়। যার মধ্যে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ নারী কোটা,১০ শতাংশ জেলা কোটা,৫ শতাংশ আদিবাসী কোটা এবং ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা। ছাত্রসমাজ কোটা পদ্ধতির বিপক্ষে গিয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন করে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের দাবি ৩০% মুক্তিযোদ্ধা কোটা অযৌক্তিক এবং বৈষম্যমূলক, এক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি। মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা সম্মান করি কোটা পদ্ধতি শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলে মেয়ে পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর এবং প্রতিবন্ধীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করা উচিত।
শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার আদায়ের দাবিতে সোচ্চার। ইতিমধ্যে প্রায় অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে নেমেছে।সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে অনেক মুক্তিযোদ্ধা কোটাধারী, আদিবাসী এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দিয়েছে।
কর্মসূচিতে জননেত্রী শেখ হাসিনা হলের কানিজ ফাতেমা নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমার নানা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিন্তু আমি নিজে কখনো এই কোটা ব্যবহার করিনি। যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি চান, তাঁদের কাছে আমার প্রশ্ন, আপনারা কি ভিক্ষা চান? আপনারা কি দয়া চান? একটু আগেও অনেককে দেখে এসেছি পাঠাগারে বসে চাকরির জন্য পড়ছেন। তাঁদের কাছে আমার আহ্বান, এভাবে কোটা বহাল থাকলে আপনারা পড়েও চাকরি পাবেন না। তাই আসুন, এসব নিয়ে কথা বলুন।
অন্যদিকে কোটার পক্ষে আল মামুন বলেন- এখনো হাজার হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বেকার অবস্থায় আছেন। অনেকেই পাঁচ-ছয়বার ভাইভা দিয়ে চাকরি পাননি। এ রকম শত শত অভিযোগের প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। ১৯৭২ সাল থেকে সঠিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে হয়ত এখন ৩০ শতাংশ কোটার প্রয়োজন থাকত না। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কারণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের হাতে বাড়িঘর ও পরিবার হারানো মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের জন্য নির্ধারিত ৩০ শতাংশ কোটার সঠিক বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে এখনো অনেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার সমাজে পিছিয়ে আছে এবং প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।
প্রাথমিক বাছাই, লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণ করার জন্য যথেষ্ট প্রার্থী থাকেন। তারপরও কিছু স্বাধীনতাবিরোধী আমলা ‘কোটায় প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না’ বলে সুকৌশলে শূন্যপদ দেখিয়ে সাধারণ প্রার্থীদের দিয়ে পদগুলো পূরণ করে নিজেদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে মুক্তিযোদ্ধা কোটার বাস্তবায়ন করেনি।
এই দীর্ঘ ২১ বছরে বঞ্চিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স শেষ হওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পর্যন্ত এই কোটা সুবিধা বর্ধিত করেন। আবার ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছর বিএনপি-জামায়াত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটা সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। এই মোট ৩০ বছর বঞ্চিত হওয়া মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে তাদের কোটা সুবিধা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটার এখনো প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
নিজস্ব মতামত - মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানার্থে সরকার তাদের জন্য অনেক সুযোগ সুবিধা প্রদান করেছেন। স্বাধীনতার এত বছর পরে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা পদ্ধতি চালু করা অযৌক্তিক। তাও যদি কোটা পদ্ধতি চালু রাখতে হয় তাহলে সেটা সংস্কার করে শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য হওয়া উচিত।
মুক্তিযোদ্ধার উত্তরসূরি দোহাই দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কোটা সুবিধা নিয়ে অনায়াসে চাকরি পেয়ে যাবে যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা। সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখলে অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী ই সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হবে এবং সরকারি চাকরির প্রতি আস্থা হারাবে।
