বিএনপি এখন কি করবে?
বিএনপি’র ভারতবিরোধী অবস্থান অনেকটা পরিস্কার। এরইমধ্যে বুধবার দেশটির পণ্য বর্জন কর্মসূচির সাথে সংহতি প্রকাশ করলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। খুলে ফেললেন গায়ে জড়ানো ভারতীয় চাদর। এখন শুধু বাকি, দলীয়ভাবে বর্জনের ঘোষণার। সূত্র বলছে, চলতি রোজায় দলীয়ভাবে ভারতীয় পণ্য বর্জনের ঘোষণা দিতে পারে বিএনপি।
তবে এ মুহূর্তে সরকার পতনের বড় কোনো আন্দোলনে যাবে না দলটি। সরব থাকবে সবধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে। পাশাপাশি জোর দেবে সারাদেশে সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধিতে। এছাড়া ভেতরে ভেতরে বাড়াবে কূটনৈতিক তৎপরতাও।
দলীয় সূত্র বলছে, এখন থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির বিষয়টি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই দেখভাল করবেন। ভেঙে দেওয়া হতে পারে ২০১৯ সালে গঠিত ফরেন রিলেশন কমিটি। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের অনেকে মনে করেন, ভারত সরাসরি আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে আসছে। তাই ভারতের ওপর কোনো প্রকার আস্থা রাখতে চায় না আর। এগোতে চায় বুঝে-শুনে। তারা বলছেন, দেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পথে আওয়ামী লীগের চেয়েও প্রতিবন্ধকতা ভারত। এ অবস্থায় ভারত বলয়ের বাইরে গণতন্ত্রের সহায়ক অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তৎপরতা বাড়াবে বিএনপি।
বুধবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে রুহুল কবির রিজভী জানান, বিএনপিসহ ৬৩টি গণতন্ত্রকামী দল এবং দেশপ্রেমিক জনগণ ভারতীয় পণ্য বর্জনের এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেছে। এসময় তিনি ভারতের তীব্র সমালোচনা করেন। ভারত প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের বক্তব্য তুলে ধরে রিজভী বলেন, ‘গত ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের জনগণের সমর্থন বা শক্তিতে নয়, ভারতের শক্তি ও সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ অবৈধভাবে ক্ষমতার সিংহাসনে টিকে আছে। আর এই টিকে থাকার জন্য যতো দমন-পীড়ন, গুম-খুন-হত্যা, মামলা-হামলা, অবিচার-অনাচার সব কিছু করছে সরাসরি ভারতের মদদে।’
এদিকে বিএনপির কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে তৃণমূলসহ বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা অনেক আগে থেকেই প্রশ্ন ছিলো। ২০১৯ সালে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে ২১ সদস্যের ফরেন রিলেশন কমিটি (এফআরসি) গঠন করা হয়। তারপর থেকে দৃশ্যমান কোনও কার্যক্রম দেখা যায়নি এ কমিটির। আমীর খসরু আর শামা ওবায়েদ ছাড়া কারোরই কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো না- এমনটাই মনে করেন দলীয় হাইকামন্ড। সূত্র বলছে, এই কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করা হতে পারে শিগগিরই।
এ প্রসঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ফরেন রিলেশন কমিটির চেয়ারম্যান আমীর আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি ও দল গোছানোর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কমিটি দিয়েছে দলটি। বুধবার রাতে স্বেচ্ছাসেবক দল অস্ট্রেলিয়া, স্পেন (উত্তর) ও মালদ্বীপ শাখার পূর্ণাঙ্গ আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এসএম জিলানী এবং সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান এসব কমিটি অনুমোদন করেন।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তৃণমূল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে খুন গুমের শিকার ১ হাজার ২০০ পরিবারের তালিকা করা হয়েছে। তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তাদের ঈদ উপহার পাঠানো হবে। এছাড়া অসুস্থ ও কারাবন্দী নেতাকর্মীদের বাসায় গিয়ে তাদের পরিবারের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। ঈদের পর যেসব জায়গায় সাংগঠনিক দুর্বলতা আছে, সেগুলো শক্তিশালী করার বিষয়ে হাত দেয়া হবে।
সূত্র জানাচ্ছে, সামনে আর কোনো ভুল করতে চায় না দলটি। খুব সাবধানে পা ফেলছে। বেশিরভাগ সিদ্ধান্তই আসছে লন্ডন থেকে এবং তা হঠাৎ করেই। দলীয় পরিকল্পনা সরকার যেন কোনোভাবেই জানতে না পারে তাই এই কৌশল। দলটির বৃহৎ আন্দোলনের প্রস্তুতি চলমান। সুযোগ বুঝে মাঠে নামার পরিকল্পনা। বিদেশি চাপ আর রাজপথের আন্দোলনে এবার আওয়ামী লীগ আর পার পাবে না বলেই তাদের বিশ্বাস।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘আন্দোলন চলমান আছে। যা কিছুই কর্মসূচি হচ্ছে সবই আন্দোলনের অংশ। চলমান এই আন্দোলন গতিশীল করতে সারাদেশে সাংগঠিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা হবে। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে জনমত গঠনের কর্মসূচিগুলো অব্যাহত থাকবে। বাকিটা পরিস্থিতি বুঝে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত।’
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিসহ সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশীরা মনে করেছিলেন, যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না। তারিখ পেছাবে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না। তার আগেই বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসবে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল সেগুলো পাত্তাই দেয়নি।
তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই পুনরায় ক্ষমতায় বসেছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের আগেও বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করতেন, আওয়ামী লীগ পুনরায় সরকার গঠন করলেও ওই সরকার ৬ মাসের বেশি স্থায়ী হবে না। বেকায়দায় ফেলবে বিদেশিরা। নানা সেক্টরে নিষেধাজ্ঞা আসবে। দেশের অর্থনীতি ভেঙে যাবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা পড়বে। এই অবস্থায় জনরোষে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হবে শেখ হাসিনা। কিন্তু বিরোধী শিবির এখন অনেকটাই হতাশ। ভেঙে গেছে তৃণমূলের মনোবলও।
জানা গেছে, ২৮ অক্টোবরের ঘটনার পর বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছেন। রমজানে ইফতার ও দোয়া মাহফিলে অংশ নিয়ে তৃণমূলকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করছেন। বুধবার ড্যাবের ইফতার মাহফিলে অংশ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, আমাদের যুদ্ধ চলছে। অঘোষিত স্বাধীনতা যুদ্ধ। এই যুদ্ধে দেশের প্রতিটি মানুষকে শরীক হতে হবে। কেননা আমরা এখন ত্রিশংকু অবস্থায় আছি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে।
দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি’র অসংখ্য নেতাকর্মী জেল খেটেছেন-খাটছেন। হামলার শিকার হয়েছেন, প্রাণ হারিয়েছেন। এলাকা ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এতকিছুর পারও তারা অপেক্ষায় পরিবর্তনের। আর তা নির্ভর করছে, সামনের দিনগুলোতে দলের নীতি-নির্ধারকদের কার্যকরি সিদ্ধান্ত, আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি এবং কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।
