১৫ হাজার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সৌরবিদ্যুৎ চালুর উদ্যোগ, ১ বছরের মধ্যে জ্বালানি নিরীক্ষা
সংগৃহীত ছবি
দেশের তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে বড় হাসপাতাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য খাতকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম অগ্রণী খাত হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ চলছে। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে দেশের সব স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ভবন ও জ্বালানি চাহিদা নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎ প্রদর্শনীতে এক প্যানেল আলোচনায় এসব কথা বলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। ‘সরকারি খাতে ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে দৃষ্টান্ত স্থাপন’ শীর্ষক এ আলোচনার আয়োজন করে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ কোনো সাধারণ সেবা নয়, বরং এটি অপরিহার্য প্রয়োজন এবং সরাসরি স্বাস্থ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। তৃণমূল পর্যায় থেকে বড় হাসপাতাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ উদ্যোগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে প্রথম অগ্রণী খাত হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, সারা দেশে তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের প্রায় ১৫ হাজার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রয়েছে। এর পাশাপাশি জেলা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল মিলিয়ে রয়েছে বিশাল স্বাস্থ্য অবকাঠামো। হাসপাতালের অধিকাংশ কার্যক্রম দিনের বেলায় পরিচালিত হয়। ফলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়ের সঙ্গে হাসপাতালের বিদ্যুৎ চাহিদার ভালো সামঞ্জস্য রয়েছে।
অপারেশন থিয়েটার, জরুরি বিভাগ, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র এবং টিকার সংরক্ষণব্যবস্থা সচল রাখতে ডিজেলনির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাসপাতালগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে ড. মুহিত বলেন, হাসপাতাল এক দিনের জন্যও বন্ধ রাখা সম্ভব নয়।
ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের নিশ্চয়তা রয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, অগ্নিনিরাপত্তায় অনুমোদিত যন্ত্রাংশ ব্যবহার এবং প্রত্যন্ত এলাকার সৌরপ্যানেল চুরি ও ক্ষতি রোধে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ লক্ষাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে কোন কোন প্রতিষ্ঠানের ছাদ সৌরবিদ্যুতের উপযোগী এবং কোথায় অতিরিক্ত জমি রয়েছে, তা যাচাই করে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হবে।
তিনি জানান, দেশের ৫০টির বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনে প্রয়োজনীয় শিল্প গড়ে তোলা এবং তরুণদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে তৈরি করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কৃষিবিদ মো. হাসান জাকির তুহিন জানান, আগামী এক বছরের মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় ১৭ হাজার সেচ পাম্পকে সৌরবিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমের বাইরে অব্যবহৃত সময়ে এসব সৌরপ্যানেল থেকে জাতীয় গ্রিডে ৪৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে। এতে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হতে পারে।
সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরে ইডকলের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের প্রধান এনামুল করিম পাভেল বলেন, সরকারি ভবনগুলোর ছাদ থেকেই প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকার নীতিমালা সহজ করেছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও বিনিয়োগকারীদের অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে সোল্যারিকের পরিচালক প্রকৌশলী নাজনীন আক্তার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সুরক্ষায় স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। সৌরবিদ্যুতের সর্বোচ্চ উৎপাদনের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্নের ঝুঁকি কমানো এবং আন্তর্জাতিক তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত সহজ করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
