সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান হান্নান কাতারে গ্রেপ্তার
ছবি : সংগৃহীত
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা দুই মামলার আসামি বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নান কাতারে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে কবে, কীভাবে এবং কোন কর্তৃপক্ষ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো জানা যায়নি।
রোববার দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে হান্নানের গ্রেপ্তারের তথ্য জানান।
তবে তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে পারেননি এই কর্মকর্তা। দুদক কীভাবে গ্রেপ্তারের খবর পেয়েছে, জানতে চাইলে আকতারুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তিনি এখনো পাননি। দুদক সচিব সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি জানাবেন।
দুদকের নথি অনুযায়ী, শেখ আব্দুল হান্নান ও তাঁর স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুটি মামলা করা হয়। দুদকের উপপরিচালক মো. তানজির হাসিব সরকার বাদী হয়ে সংস্থাটির সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ মামলা দুটি করেন।
হান্নানের বিরুদ্ধে ৩ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ
দুদকের অভিযোগ, শেখ আব্দুল হান্নান জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ৩ কোটি ২৮ লাখ ৫১ হাজার ৫০৬ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। এ ছাড়া তাঁর নামে থাকা ছয়টি ব্যাংক হিসাবে ২৭ কোটি ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালের ২৭ জুলাই দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছিলেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক অসদাচরণের মাধ্যমে এসব সম্পদ অর্জন করেছেন সাবেক এই বিমান বাহিনী প্রধান। ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থের উৎস গোপন করার অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়।
স্ত্রীর বিরুদ্ধেও অবৈধ সম্পদ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ
হান্নানের স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধেও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ১ কোটি ৯১ লাখ ৯০ হাজার ৩০৪ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনেছে দুদক। তাঁর নামে থাকা ৩২টি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ১৮ লাখ ১৯ হাজার ৯২৩ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথাও জানায় সংস্থাটি। মামলার অভিযোগে বলা হয়, স্বামীর সহায়তায় এসব সম্পদ অর্জন করেছেন তাহমিদা। এ মামলায় তাঁর পাশাপাশি শেখ আব্দুল হান্নানকেও আসামি করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে কাতার ও দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে হান্নানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। এ ছাড়া কানাডায় তাঁর সন্তানদের নামে বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়ার দাবিও করে সংস্থাটি। এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও উৎস মামলার তদন্তে যাচাই করার কথা জানিয়েছিল দুদক।
বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, জব্দ সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব
দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যে ২০২৫ সালের ৫ মে শেখ আব্দুল হান্নান, তাঁর স্ত্রী তাহমিদা বেগম ও ছেলে শেখ লাবিব হান্নানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। পরদিন দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হান্নানের জমি, বাড়ি ও তিনটি ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর ছয়টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন আদালত। ওই বছরের ২৪ মে হান্নান, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের নামে থাকা মোট ৩৮টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেওয়া হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর হান্নানের সহযোগী সানজিদা আক্তারের নামে থাকা দুটি ফ্ল্যাট জব্দ এবং ১০টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন আদালত। দুদকের আবেদনে অভিযোগ করা হয়, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ গোপন করতে সানজিদার নামে ফ্ল্যাট দুটি কেনা হয়েছিল।
চলতি বছরের ৩০ মার্চ হান্নান ও তাঁর স্ত্রী তাহমিদার আয়কর নথি জব্দের আদেশ দেন আদালত। মামলার তদন্তের প্রয়োজনে দুদকের পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় হান্নানের নামে থাকা ৩৪ শতাংশ জমি ক্রোকের আদেশ দেন আদালত। দুদকের আবেদনে জমিটির দলিলমূল্য ১৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়।
২০২১ সালে বিমান বাহিনীর প্রধান হন হান্নান
শেখ হাসিনা সরকারের সময় ২০২১ সালের ১২ জুন বিমান বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন শেখ আব্দুল হান্নান। ২০২৪ সালের ১১ জুন তিনি অবসরে যান। এরপর ওই বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে সাবেক এই বিমান বাহিনী প্রধানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক, যার ধারাবাহিকতায় তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়।
তবে কাতারে তাঁর গ্রেপ্তারের পরিস্থিতি, গ্রেপ্তারকারী কর্তৃপক্ষ এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
