আশ্রমের নামে যা করতেন মিল্টন সমাদ্দার
মিল্টন সমাদ্দার। মানবতার ফেরিওয়ালা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে মিল্টন এক প্রতারকের নাম। অভিযোগ রয়েছে, বৃদ্ধাশ্রমে থাকা অসহায় মানুষগুলো ওপর নির্যাতন চালাতেন তিনি। শুধু তাই নয় ঘরহীন-পরিচয়হীন মানুষকে আশ্রয় দিয়ে কিডনি বিক্রি করা ও মানবপাচারের মতো ভয়ংকর সব অপরাধের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে করা মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফজাতে রয়েছেন মিল্টন। রোববার তার স্ত্রী মিতু হালদারকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছে ডিবি পুলিশ।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, সকল অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে মিল্টনকে। অনেক প্রশ্নেরই জবাব মিলছে না। কৌশলে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করছেন তিনি।
মিল্টনের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগের বিষযে রাজধানীর কল্যাণপুরের ‘চাইল্ড এন্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’ নামের বৃদ্ধাশ্রমের ভবনের আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। মিল্টনের আশ্রয় কেন্দ্রের পাশের ভবনে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি করেন আব্দুল মাহমুদ। তিনি দ্য নিউজকে বলেন, আশ্রয় কেন্দ্রের অসহায় বৃদ্ধ ও নারীদের ওপর নির্যাতন করা হত। আমি নিজের চোখে সেই দৃশ্য দেখেছি। তিনি বলেন, বৃদ্ধাশ্রমের বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাদের মুখে জোর করে গরম খিচুড়ি ঢেলে দেয়া হত। তারা সেই গরম খিচুড়ি খেতে না চাইলে তাদের মারধর করা হত। আমাদের বিল্ডিং থেকে সব দেখা যেত।
কল্যাণপুরের বাসিন্দা মোস্তফা আরিফ বাবু বলেন, এই বৃদ্ধাশ্রম সম্পর্কে কখনো ভালো কিছু শুনিনি। এটি একটি রহস্যময় ভবন। এর মধ্যে স্থানীয়দের ঢুকতে দেয়া হত না। মাঝেমধ্যেই এই আশ্রম থেকে কান্নার শব্দ শোনা যেতো।
একই এলাকার বাসিন্দা মাজহার মাহমুদ বলেন, মিল্টনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ শোনা যাচ্ছে এরকম কিছু আমার চোখে পড়েনি। সবসময় তাকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখেছি। তাকেও আমি ভালো মানুষ হিসেবেই জানি। সত্য-মিথ্যা আল্লাহ ভালো জানেন।
দ্য নিউজের প্রতিবেদক আশ্রমের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে চাইল্ড এন্ড ওল্ড এইজ কেয়ারের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা বাধা দেন। তারা জানান আশ্রমের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে প্রশাসনের অনুমতি লাগবে। বৃদ্ধাশ্রমে এখন কতজন অসহায় মানুষ আছেন জানতে চাইলে, সংস্থাটির সেচ্ছাসেবক মো. রাসেল হাওলাদার বলেন, কল্যাণপুরের এই ভবনে ২০ রোগী রয়েছে। এছাড়া সাভারের বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছেন নিজ বাসা থেকে বিতাড়িত হওয়া ২৬৫ জন বয়স্ক নর-নারী। মিল্টন সমাদ্দার ছাড়া এসকল অসহায় মানুষদের দেখাশোনা ও খাবারের ব্যবস্থা করতে কষ্ট হচ্ছে। আজ পাশের এক দোকান থেকে খাদ্যদ্রব্য কিনে রান্না করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এসময় সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথোপকথন শুনছিলেন কল্যাণপুরের এক বাসিন্দা মনিরুজ্জামান। এসময় তিনি দ্য নিউজকে বলেন, মিল্টন সহজেই মেজাজ হারিয়ে ফেলতেন। যাকে তাকে মারধর করতেন। সে অপরাধী হলে তার বিচার হোক। কিন্তু এই আশ্রমে যেসব অসহায় মানুষ রয়েছে তাদের যেনো কষ্ট করতে না হয়। প্রয়োজনে এই সংস্থাটিকে সরকারিকরণ করার দাবি জানাচ্ছি।
এদিকে মিল্টন সমাদ্দারের স্ত্রী মিতু হালদারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। আগামীকাল রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ বলেছেন, মিল্টন সমাদ্দার রিমান্ডে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ সেসব বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার আশ্রয়কেন্দ্রের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে মিল্টনের স্ত্রীকে রোববার ডিবিতে ডাকা হয়েছে। তার স্ত্রীকেও আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করব।
মিল্টন সমাদ্দারকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেসব বিষয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে। তার উত্থান কীভাবে হলো, তথাকথিত মানবতার ফেরিওয়ালা কিভাবে হলেন, তার অর্থের উৎস কী, কিভাবে সে দরিদ্র মানুষকে সংগ্রহ করত এবং কেনই বা তাদের টর্চার সেলে নিয়ে মারধর করতেন। এসব বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
