স্মৃতির শহীদ মিনার ভরে যাবে ফুলে ফুলে
অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
আগামীকাল অমর একুশে ফেব্রুয়ারি, আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস। কাল মাতৃভাষা আন্দোলনের ৭২ বছর। মায়ের ভাষা বাংলার মর্যাদা সমুন্নত রাখা ও ভাষা শহীদদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগকে মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। বুধবার (২১ ফেব্রুয়ারি) ভাষা শহীদদের ত্যাগের স্মৃতি শহীদ মিনার আজ ভরে যাবে ফুলে ফুলে। ১২টা ১মিনিট থেকে দিনভর লাখ লাখ মানুষ ফুল হাতে নগ্ন পায়ে শ্রদ্ধা জানাবে বীর শহীদদের।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায়, বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৩-এর প্রতিপাদ্য হলো 'বহুভাষিক শিক্ষা- একটি বহুভাষিক বিশ্বে শিক্ষাকে রূপান্তরিত করার প্রয়োজনীয়তা'।
আজ রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে একুশের কর্মসূচি শুরু হবে। প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এছাড়াও কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা জানানো হবে । ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদরা জাতিকে সে মহৎ ও দুর্লভ উত্তরাধিকার দিয়ে গেছেন।
১৯৫২ সালের এদিনে ‘বাংলাকে’ রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসক গোষ্ঠির চোখ-রাঙ্গানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস থেকে ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্র-ছাত্রীরা মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও কয়েকজন মাটির বীর সন্তান।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেছেন, 'অমর একুশের চেতনা এখন বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অনুপ্রেরণার উৎস। তবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঠিক চর্চা ও সংরক্ষণে আমাদের আরও বেশি পরিশ্রমী হতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির আশীর্বাদে আমরা এখন একই বৈশ্বিক গ্রামের বাসিন্দা। তাই উন্নত বিশ্বের সঙ্গে অগ্রগতির ধারা বজায় রাখতে আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে বিভিন্ন ভাষায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত।'
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শ অনুসরণ করে গত ১৪ বছরে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছি। আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তর করব- স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সরকার, স্মার্ট ইকোনমি ও স্মার্ট সোসাইটি গড়ে তুলব।
একুশে ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি। এদিন দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সঠিক নিয়মে, সঠিক রং ও মাপে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে।
দিবসটি পালন উপলক্ষে জাতীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ ও কোরানখানির আয়োজনসহ দেশের সকল উপাসনালয়ে ভাষা শহিদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মিশনসমূহ শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বাণী পাঠ, বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন বিষয়ক আলোচনা সভা, পুস্তক ও চিত্র প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করবে যেখানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং বাঙালি অভিবাসীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এছাড়াও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্যাপন উপলক্ষে ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়কদ্বীপ সমূহ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা জনক স্থান সমূহে বাংলাসহ অন্যান্য ভাষার বর্ণমালা সম্বলিত ফেস্টুন দ্বারা সজ্জিত করা হয়েছে। একুশের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার এবং ভাষা শহিদদের সঠিক নাম উচ্চারণ, শহিদ দিবসের ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা, শহিদ মিনারের মর্যাদা সমুন্নত রাখা, সুশৃঙ্খলভাবে শহিদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ, ইত্যাদি জনসচেতনতা মূলক বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যম সমূহ প্রয়োজনীয় প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সংবাদপত্র সমূহে ক্রোড়পত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানের বিষয়টি বিশেষভাবে উপস্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো একুশের বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ দুইদিনব্যাপি বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে পুস্পার্ঘ্য অর্পণ, সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারাদেশে সংগঠনের সকল কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত করণ ও কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ এবং প্রভাতফেরি।
এছাড়াও, ২২ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টায় রাজধানীর তেজগাঁওস্থ ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে সভাপতিত্ব করবেন। অমর একুশে উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিও দু’দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বেচ্ছাসেবী ও ছাত্র সংগঠন গুলো শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি পালন করে।
এদিকে, দিবসটি উপলক্ষে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রোববার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেছেন, ভাষা শহীদ দিবস বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে জঙ্গি হামলার কোনো সম্ভাবনা নেই, কারণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপি প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিয়েছে।
কমিশনার বলেন, 'নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা পলাশী থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে নিয়ে এসেছি। পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করা হবে।'
তিনি বলেন, 'কর্মসূচিকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং কূটনৈতিক কর্মকর্তারা প্রথমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। তারপর, সাধারণ মানুষের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হবে।'
ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মানুষ পলাশী দিয়ে প্রবেশ করবে এবং দোয়েল চত্বর দিয়ে প্রস্থান করবে জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, কোনো ব্যাগ বা অন্যান্য জিনিসপত্র বহন করতে দেয়া হবে না।
