দেশে গরুর চেয়ে এগিয়ে ছাগল
দেশে প্রতিবছরই গরু-ছাগলের সংখ্যা বাড়ছে। তবে অতীতে গরুর উৎপাদন বেশি হলেও বর্তমানে এগিয়ে রয়েছে ছাগল। প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে গরুর উৎপাদন হয়েছিলো ২ কোটি ২৯ লাখ ৭৬ হাজার। আর ছাগলের সংখ্যা ছিলো ২ কোটি ২৪ লাখ ১ হাজার। সে হিসাবে ওই অর্থবছরে গরুর চেয়ে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ছাগল কম উৎপাদন হয়। কিন্তু এরপর অতীতের রেকর্ড ভেঙে ছাগল পৌঁছে যায় শীর্ষে। বতর্মান দেশে গরুর তুলনায় বাড়তি ছাগলের সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ। এছাড়া বেড়েছে ভেড়া-মহিষের উৎপাদনও। তবে গবাদি পশুর এই ক্রমবর্ধমান উৎপাদনেও মাংসের দামে ভাটা পড়েনি। বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। এতে করে দেশের নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তের কাছেও গবাদি পশুর মাংস এখন বিলাসী খাদ্য। মাংস ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর পেছনে দায়ী মূলত: গো-খাদ্যের আকাশচুম্বি দাম।
প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যানুযায়ী, গত ১৫ বছরে দেশে গরু বেড়েছে ১৮ লাখ ৮০ হাজার এবং ছাগল বেড়েছে ৪৫ লাখ ৪৪ হাজার। এই সময়ে মহিষ বেড়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার এবং ভেড়া বেড়েছে ৯ লাখ ৫০ হাজার।
প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিভাগ জানিয়েছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে গরুর ছিলো ২ কোটি ২৯ লাখ ৭৬ হাজার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৪৮ লাখ ৫৬ হাজার। ১৫ বছরের বেড়েছে ১৮ লাখ ৮০ হাজার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ছাগলের সংখ্যা ছিলো ২ কোটি ২৪ লাখ ১ হাজার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৬৯ লাখ ৪৫ হাজার। ১৫ বছরে ছাগলে বেড়ে ৪৫ লাখ ৪৪ হাজার।
বাগেরহাটের গৃহিনী মমতাজ বেগম বলেন, আমি দুই বছর আগে একটি ছাগল কিনেছিলাম। দুই বছর ধরে সেটিতে ৪টি করে বাচ্চা দিচ্ছে। ক’দিন আগেও দুটি বিক্রি করেছি ১৪ হাজার টাকায়।
তথ্যানুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মহিষের সংখ্যা ছিলো ১৩ লাখ ৪ হাজার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ১৫ লাখ ১৬ হাজার। মহিষ বেড়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশের ভেড়ার সংখ্যা ছিলো ২৮ লাখ ৭৭ হাজার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ৩৮ লাখ ২৭ হাজার। মহিষ বেড়েছে ৯ লাখ ৫০ হাজার।
বাগেরহাটের আরেক খামারী বলেন, তিনি অর্গানিক পদ্ধতিতে গরু পালন করেন। বর্তমানে তার গরুর সংখ্যা ৬টি। তিনি ঘাস খাওয়ান। পাশাপাশি ভুট্টা আর ভূসি। বর্তমানে ভুট্টার কেজি ৩৬ টাকা আর ভূসির কেজি ৪৬ টাকা। এই খামারী বলেন, একটি গরুর পেছনে বছরে নুন্যতম ৫ হাজার টাকার ডাক্তার ও ওষুধ ব্যয় হয়। খাবারে খরচ আছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। ঘাস খাওয়াতে না পারলে খরচ আরও বেশি হয়।
এদিকে দেশে গবাদি পশুর উৎপাদন বাড়লেও মাংসের দাম না কমায় ভোক্তা পর্যায়ে রয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা ডা. হোসেন মো. সেলিম বলেন, অনেক সময়ই আমরা একটা অভিযোগ শুনি, গরু-ছাগল এতো বাড়লেও মাংসের দাম কমে না কেন? মাংসের উৎপাদন কম কেন? আসলে বিষয়টা এমন নয়। এখানে একটু ভুল বোঝাবুঝি আছে। মাংসের হিসাবটা হয় অন্যভাবে। হিসাবটা আসে জবাই করার পর। কোরবানির সময় যে পরিমাণ গরু বাজারে ওঠে, সব তো বিক্রি হয় না। অবিক্রিত থেকে যায়। সেগুলো খামারিরা ফিরিয়ে নিয়ে যান। সেই হিসাব তো আসে না। হিসাবে আসে শুধু জবাইয়ের পর মাংসের। এ কারণে গরু সংখ্যা আর মাংসে পার্থক্য থাকে।
মাংসের দাম নিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, মাংসের দাম না কমার নেপথ্যে খাবারের দাম। খামারিরা দানাদার খাবার বেশি খাওয়ান। যেমন ভাট্টা ভুষি এসব। এছাড়া নানা ধরনের ভিটামিন তো রয়েছেই। যেগুলোর দাম বেশি। সেকারণে তাদের খরচও বেশি পড়ে যায়।
কাঁচা ঘাস খাওয়ালে খরচ কম পড়বে, দামও কমে যাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরামর্শ দিচ্ছি খামারিরা যাতে কাঁচাঘাস খাওয়ান। গরু-ছাগল-মহিষ বাণিজ্যিকভাবে পালন করতে হলে অবশ্যই তাদের ঘাসও চাষ করতে হবে। অন্য খাবার খাওয়ালে যে পরিমাণ খরচ হবে, ঘাস খাওয়ালে খরচ অনেক কম হয়। তাই গরু ছাগল বা মহিষের খামার করতে হলে, ঘাসও চাষ করতে হবে। কাঁচা ঘাসের বিকল্প নেই।
উৎপাদন খরচের ৭০ শতাংশই চলে যায় খাবারে উল্লেখ করে ডা. হোসেন মো. সেলিম বলেন, এই খরচটা কমিয়ে আনতে পারলে সবারই লাভ। টিএমএস প্রচলন করতে পারলে খাবার খরচ কমে আসবে। তিনি দাবি করেন ঘাস নির্ভর হওয়ার কারণে অর্গানিক খামারিরা বেশি লাভ করছেন।
বাজারে নানা ধরনের ভিটামিন জাতীয় খাবার পাওয়া যায়। এগুলো না খাওয়ানো পরামর্শ দিয়ে ডা. হোসেন মো. সেলিম বলেন, গরুর শরীরে ভিটামিন উৎপন্ন হয়। সুতরাং বাজারে যেসব ভিটামিন পাওয়া যায় এগুলো কিনে খাওয়ানো কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। এগুলো খাওয়ানোই খরচ বেড়ে যায়। বিভিন্ন কোম্পানি সিস্টেমে এগুলো মার্কেটিং করে খাওয়াতে বাধ্য করছে। কিন্তু খামারিদের এগুলো না খাওয়ানোই উচিত।
