ঢাকার গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা, উদ্যোগের পরও ফেরেনি শৃঙ্খলা
সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বন্ধ হয়ে গেছে ঢাকা নগর পরিবহন, অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নেই ই-টিকিটিং ব্যবস্থা। নির্ধারিত স্টপেজের বদলে সড়কের মাঝখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো, ফ্লাইওভারে বাস থামানো এবং যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল যানজটকে আরও জটিল করে তুলছে। সম্প্রতি ডিজেলের দাম বাড়ার পর বাসভাড়া আদায় নিয়েও নতুন করে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সিএনজিচালিত বাসেও বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সব মিলিয়ে নগরবাসীর দুর্ভোগ কমার বদলে বেড়েই চলেছে।
রাজধানীর সড়কে এখনো চলাচল করছে বহু ফিটনেসবিহীন ও জরাজীর্ণ বাস। সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে পাঁচ লাখের বেশি ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন রয়েছে। ঢাকায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাস ও মিনিবাস যাত্রী পরিবহন করলেও এর বাইরে কত ফিটনেসবিহীন যান চলছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) কাছে।
গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক রুটভিত্তিক কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনার উদ্যোগ নেন। তাঁর মৃত্যুর পর এ কার্যক্রমের দায়িত্ব পান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন। পরে মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের সময়েও উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়। এ ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে চালু হয় ঢাকা নগর পরিবহন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেবাটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির সর্বশেষ ২৯তম সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাস রুট রেশনালাইজেশনের মূল পরিকল্পনা ছিল বাসগুলোকে নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে পরিচালনা, পুরোনো যান সরিয়ে আধুনিক বাস চালু এবং রাজধানীর বাইরে আন্তজেলা বাস টার্মিনাল ও ডিপো নির্মাণ। যৌথ উদ্যোগে কোম্পানি গঠন করে ধাপে ধাপে সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু নানা বাধায় ২০২১ সালে শুরু হওয়া কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের দাবি, আগের সরকারের সময়ে প্রভাবশালী পরিবহন নেতাদের বিরোধিতা ও বাসমালিকদের হয়রানির কারণে ঢাকা নগর পরিবহন কার্যকরভাবে এগোতে পারেনি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজনীয় নীতির পরিবর্তে বাস্তবে উল্টো পথে চলা হচ্ছে। সরকার বদলালেও এ খাতে শৃঙ্খলা আসছে না। তাঁর মতে, গণপরিবহনের মান উন্নয়ন এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। তিনি আরও বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অলিগলি ছাড়িয়ে মূল সড়কে চলাচল করায় ঢাকার যানজট ও বিশৃঙ্খলা বেড়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক মনে করেন, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা জরুরি। তিনি ঢাকার হাতিরঝিলের গণপরিবহনব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে বাস নির্ধারিত স্টপেজে সারিবদ্ধভাবে যাত্রী ওঠায়। দায়িত্বশীলরা চাইলে রাজধানীর অন্যান্য সড়কেও এমন ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। তাঁর মতে, ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ করা গেলে সড়কের অনেক সমস্যার সমাধান হবে।
অন্যদিকে, যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় বাসের মধ্যে পাল্লা দেওয়া, অতিরিক্ত গতিতে চলা এবং নির্ধারিত স্থান ছাড়া যাত্রী ওঠানো-নামানোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। চালকদের দৈনিক নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা মালিককে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় বেশি যাত্রী তোলার প্রবণতা তৈরি হয় বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, কম মজুরি, ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ না হওয়া এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় না আসাও সড়কের বিশৃঙ্খলা বাড়াচ্ছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি বদলাতে চালকদের প্রশিক্ষণ, চুক্তিভিত্তিক মজুরির পরিবর্তে স্থায়ী বেতনব্যবস্থা, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং আধুনিক নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি যাত্রীদের সচেতনতা বাড়ানো এবং ভাড়া নিয়ে অসংগতি দূর করতে বিআরটিএর কার্যকর নির্দেশনা জরুরি। পরিকল্পনার পাশাপাশি এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা না গেলে রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হবে।
