‘নরেন্দ্র মোদি ভারতের জন্য পাকিস্তানের চেয়েও বড় হুমকি’
তিন সপ্তাহ চুপ থাকার পর ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান অবশেষে স্বীকার করেছেন—পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে ভারতের বিমানবাহিনী ক্ষয়ক্ষতি ভোগ করেছে। এই দেরিতে স্বীকারোক্তি ভারতের সরকারি বয়ান ও বাস্তবতার ফারাককে সামনে নিয়ে এসেছে।
মে ২০২৫-এ ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ব্যর্থতা মোদি সরকারের মিথ্যা প্রচারের দেয়াল ভেঙে দেয়। দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি সরকার পাকিস্তানকে টার্গেট করে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ ও 'দেশপ্রেমের নাটক' চালিয়ে আসছে। কিন্তু ইতিহাসের আয়নায় ধরা পড়ে যায় এই মেকি দেশপ্রেমের আসল চেহারা।
মোদি কেবল প্রধানমন্ত্রী নন—তিনি একটি উগ্র আদর্শের প্রতীক, যে আদর্শ মহাত্মা গান্ধীর হত্যার জন্ম দিয়েছিল। হত্যাকারী নাথুরাম গডসে ছিলেন আরএসএস-এর সদস্য। যদিও গডসে দাবি করেছিলেন, তিনি সংগঠনটি ছেড়ে দিয়েছিলেন, বিবিসির সাম্প্রতিক তদন্ত বলছে—তিনি কখনোই আরএসএস ছাড়েননি।
আরএসএস ও বিজেপির নেতারা আজও গডসেকে ‘দেশপ্রেমিক’ বলে প্রশংসা করেন। প্রশ্ন ওঠে—যারা নিজেদের 'বাপু'-এর খুনিকে মহিমান্বিত করে, তারা আসলে কাকে প্রতিনিধিত্ব করছে?
আরএসএস ভারতের সংবিধান ও জাতীয় প্রতীক মানে না। সংগঠনটির দ্বিতীয় প্রধান এম.এস. গোলওয়ালকর তার ‘Bunch of Thoughts’ বইয়ে ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকার বিরোধিতা করে গেরুয়া পতাকার পক্ষে মত দেন। ইতিহাস জানায়, আরএসএস তিনবার নিষিদ্ধ হয়েছে—গান্ধী হত্যার পর, ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময় এবং ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর।
২০২৫ সালের মে মাসে সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র ইউনিফর্ম পরে বিতর্কিত ধর্মীয় নেতা রামভদ্রাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই ধর্মগুরু পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করেন, যা সেনাপ্রধানের উপস্থিতিতে সমর্থন পায়। ধর্ম ও রাজনীতির এই মিশ্রণ ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিজেপি ও আরএসএস ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণা সামনে এনেছে, যা আফগানিস্তান থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত এক সাম্রাজ্যের স্বপ্ন। এমন মানচিত্র ভারতীয় সংসদে প্রদর্শন করা হয়েছে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোকে চিন্তিত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া একে ‘নব্য-সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা’ বলছে।
আরএসএস এর লক্ষ্য—অ-হিন্দুদের ‘ঘর ওয়াপসি’-র মাধ্যমে হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনা। মোহন ভাগবতের মতে, ভারতের সব নাগরিকই হিন্দু। এই আদর্শ দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ান ও ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট বলছে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা RAW বাংলাদেশে ‘বঙ্গভূমি’ নামে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র করছে। গবেষক অবিনাশ পালিওয়ালও তার বই ‘My Enemy’s Enemy’-তে পাকিস্তানি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের তথ্য দেন।
মোদির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—তিনি ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার সময় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, যেখানে মুসলমানদের উপর ব্যাপক সহিংসতা হয়। পশ্চিমা মিডিয়া তাকে ‘গুজরাটের কসাই’ আখ্যা দেয়। সাবেক আরএসএস কর্মী যশবন্ত শিন্ডে স্বীকার করেছেন, মুসলমানদের দোষারোপ করতে সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
সাউথ এশিয়ায় ভারতের হস্তক্ষেপ, বিজেপির ‘অখণ্ড ভারত’ স্বপ্ন এবং আরএসএস-এর ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ শুধু ভারতের সংখ্যালঘুদের জন্য নয়, সমগ্র অঞ্চলের জন্যই হুমকি। জাতিসংঘে এই সম্প্রসারণবাদী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিবাদ জরুরি।
সবশেষে, ভারতের জনগণের উচিত নিজেদের ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে, সেই শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো—যারা একসময় জাতির পিতাকে হত্যা করেছিল এবং আজও দেশকে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
(এই নিবন্ধটি ২ জুন ২০২৫ তারিখে জিও নিউজ-এ প্রকাশিত হয়।)
