এবার ভারতীয় কোম্পানিগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
সংগৃহীত ছবি
ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করার অভিযোগে ভারতীয় ব্যবসায়ী দম্পতি এবং তাদের সাথে যুক্ত বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার (৪ নভেম্বর) মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় এই পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়।
ইরানি পেট্রোলিয়াম বহনকারী জাহাজগুলোর জন্য ‘ভুয়া পতাকা’ (ফলস ফ্ল্যাগ) এবং জাল সামুদ্রিক সনদপত্র প্রদানকারী একটি নেটওয়ার্ককে চিহ্নিত করা ও তাদের কার্যক্রম ব্যাহত করার লক্ষ্যে ওয়াশিটন এই নিষেধ্জ্ঞা জারি করেছে। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছেন চণ্ডীগড়ভিত্তিক ব্যবসায়ী সুনীল কুমার শর্মা ও তার স্ত্রী জাসপ্রীত প্রীতি শহীদ এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত ভারতের একাধিক কোম্পানি।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তারা এমন একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন, যা ইরানি জ্বালানি তেল পরিবহনকারী জাহাজগুলোকে ভুয়া নিবন্ধন ও সনদপত্র সরবরাহ করত। এছাড়া এই দম্পতির সাথে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে ভূমিকা রাখার অভিযোগে অশ্বনী কুমার ধীমান ও ইশভিন্দর সিং নামের আরও দুই ভারতীয় নাগরিকের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যারা শর্মার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোতে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শর্মা ও শহীদ চণ্ডীগড় থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তারা বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষের পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া সামুদ্রিক নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের নেটওয়ার্ক এমন সব ওয়েবসাইট তৈরি করেছিল, যেখানে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের কোনো অনুমোদন ছাড়াই জাহাজের নিবন্ধন, পতাকা প্রদান, নাবিকদের প্রশিক্ষণ এবং জাহাজের শ্রেণিবিভাগ সংক্রান্ত সেবা দেওয়ার দাবি করা হতো। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অভিযোগ, ২০১৪ সাল থেকে এই দম্পতি ক্যারিবীয় দেশ ডোমিনিকার সামুদ্রিক পতাকা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের পরিচয় ধারণ করার চেষ্টা করেছিলেন।
২০২৩ সালে শর্মা সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘এসওয়াতিনি মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল শিপ রেজিস্ট্রি প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। যদিও এসওয়াতিনি কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়ে দিয়েছিল, তবুও এটি ইরানি তেল বহনকারী জাহাজগুলোকে নিবন্ধন সেবা প্রদান অব্যাহত রেখেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ এমন কিছু ওয়েবসাইটও শনাক্ত করেছে, যেগুলো আরুবা, গায়ানা, মালি, মোজাম্বিক, মালাউই, সিন্ট মার্টেন এবং তিমুর-লেস্তের মতো দেশ ও অঞ্চলের পক্ষ থেকে সামুদ্রিক নিবন্ধন সেবা দেওয়ার মিথ্যা দাবি করত।নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া বেশ কয়েকটি জাহাজ এই ভুয়া নিবন্ধন ব্যবস্থা ব্যবহার করেই আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ইরানি পেট্রোলিয়াম পরিবহন অব্যাহত রেখেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে একাধিক ভারতীয় কোম্পানি
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ভারতীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ওশেনিক টেকনোলজিস ইন্ডিয়া’ , যার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন শর্মা। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এই কোম্পানিটিকে ব্যবহার করে ভুয়া জাহাজ নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল; যার মধ্যে আরুবা, নিকারাগুয়া এবং সিন্ট মার্টেনের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করা নিবন্ধনগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল। শহীদের সঙ্গে কথিত যোগসূত্রের জন্য আর্যাবর্ত শিপ ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড নামক আরেকটি কোম্পানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ধীমান এবং সিংকে এই কোম্পানির পক্ষে কাজ করার অভিযোগে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হওয়া অন্যান্য ভারতভিত্তিক সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রিসেপ্ট ট্রেন্ডস প্রাইভেট লিমিটেড, পলিনেশিয়া মেরিটাইম প্রাইভেট লিমিটেড, অ্যালেক্সারিয়া ফিনসার্ভ প্রাইভেট লিমিটেড, অ্যালেক্সারিয়া মিডিয়া অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড, বিহারাবোটিং প্রাইভেট লিমিটেড এবং আর্যাবর্ত মেরিটাইম অ্যান্ড এডুকেশনাল ট্রাস্ট। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ বলেছে, শর্মার কার্যকলাপ বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করায় শহীদ এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকটি ব্যবসার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, অন্তত কাগজে-কলমে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ওয়াশিংটন সেইসব ব্যক্তি ও সংস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করবে যারা তাদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরানি শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করে চলেছে। বিভাগটি বলেছে, জাল জাহাজ নিবন্ধনের মাধ্যমে জাহাজগুলো নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশগত ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য তৈরি আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন এড়িয়ে চলতে পারে।
এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় মার্কিন এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কোম্পানিগুলোর সম্পদ এবং আর্থিক স্বার্থ বাজেয়াপ্ত করা হবে। মার্কিন নাগরিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এদের সঙ্গে কোনো ধরনের লেনদেন করা নিষিদ্ধ; তবে ট্রেজারি বিভাগের ‘অফিস অফ ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল’ থেকে বিশেষ অনুমোদন থাকলে তা ভিন্ন কথা।
এই বিধিনিষেধগুলো এমন অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে, যার অন্তত ৫০ শতাংশ মালিকানা (প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে) নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে রয়েছে। ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, মার্কিন নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান নয় এমন ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও যদি এমন কোনো লেনদেনে সহায়তা করে যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে, অথবা অন্য কাউকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করে, তবে তাদেরও কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গোপন তেল ট্যাঙ্কার বহরের অবশিষ্ট অংশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই বহরটি মূলত বিদেশে তেল পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো এবং এর আওতায় ১৭টি জাহাজ রয়েছে।
সূত্র: এএফপি, ইন্ডিয়া টুডে।
