মক্কা চুক্তির সামনে প্রথম বড় পরীক্ষা
সংগৃহীত ছবি
মক্কার আকাশে একটি ড্রোন। শহরের নিষিদ্ধ আকাশসীমায় ঢোকার আগেই সৌদি বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেটিকে ভূপাতিত করেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বলছে, ড্রোনটি হুতিদের। হুতিরা অবশ্য মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার কথা অস্বীকার করেছে।
ঘটনাটি ঘটল এমন এক সময়ে, যখন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে করা নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। ৭ আগস্ট মক্কায় তিন দেশ এই চুক্তি সই করে।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তি সইয়ের এক মাসও পার হয়নি। এর মধ্যেই সৌদি আরবকে হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবেলা করতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—প্রয়োজনে পাকিস্তান ও তুরস্ক কতটা এগিয়ে আসবে?
মক্কার কাছে কেন এই হামলা এত গুরুত্বপূর্ণ :
ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, ১৫ সেপ্টেম্বর মক্কার দক্ষিণে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়।
তার দাবি, এটি মক্কার দিকে হুতিদের দ্বিতীয় হামলার চেষ্টা। তিনি পবিত্র দুই মসজিদ ও হাজিদের নিরাপত্তাকে ‘লাল রেখা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হুতিদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলেছে, মক্কা বা অন্য কোনো পবিত্র স্থান তাদের লক্ষ্য ছিল না। এই বিরোধী বক্তব্যের কারণে ড্রোনটির আসল লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
তবে একটি বিষয় নিয়ে সন্দেহ নেই—মক্কার কাছাকাছি কোনো সামরিক হামলা সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।
মক্কা শুধু সৌদি আরবের একটি শহর নয়। মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান কাবা এখানে অবস্থিত। প্রতিবছর হজ ও সারা বছর ওমরাহ পালনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এখানে আসেন। ফলে মক্কার আকাশসীমার নিরাপত্তা সৌদি সরকারের কাছে অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চুক্তির বাস্তব পরীক্ষা কোথায় :
মক্কা চুক্তির ভাষা শক্তিশালী। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ এত সরল নয়। চুক্তিতে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার কথা বলা হলেও, কোনো হামলার পর ঠিক কিভাবে অন্য দুই দেশ সামরিক সহায়তা দেবে, তার বিস্তারিত প্রকাশ্যে নেই। অর্থাৎ সৌদি আরব আক্রান্ত হলেই পাকিস্তানি বা তুর্কি সেনা সরাসরি ইয়েমেনে গিয়ে যুদ্ধ করবে—এমন কথা চুক্তি থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও বলেছেন, চুক্তির আওতায় প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে এবং আক্রান্ত দেশ কী ধরনের সহায়তা চায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই মক্কার কাছে ড্রোন হামলাটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি চুক্তির কাগজের ভাষাকে বাস্তব পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করিয়েছে।
পাকিস্তান কি যুদ্ধে যাবে? সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক বহু পুরনো। নতুন চুক্তির পরও সেই সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
তবে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে যাওয়ার প্রশ্নে পাকিস্তান সতর্ক। ১০ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদ জানিয়েছিল, সাম্প্রতিক হুতি হামলার পর মক্কা চুক্তির আওতায় কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়নি। একই সঙ্গে তারা চুক্তির প্রতি নিজেদের অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছে।
এখানে পার্থক্যটা পরিষ্কার। সৌদি আরবকে নিজের ভূখণ্ড রক্ষায় সাহায্য করা এক বিষয়। আর ইয়েমেনে গিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আরেক বিষয়। পাকিস্তান দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কতটা যাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তুরস্কের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ :
তুরস্কও সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা অংশীদার। কিন্তু আঙ্কারার জন্য ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া সহজ সিদ্ধান্ত নয়।
তুরস্ক একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ফলে সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা এবং ইয়েমেনের ভেতরে সামরিক অভিযান—দুই বিষয়কে তারা একইভাবে দেখবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এর মধ্যে ইসরায়েলের প্রসঙ্গ কেন এলো?
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের কথিত নিরাপত্তা যোগাযোগ নিয়ে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য পেতে সৌদি আরব ইসরায়েলের সহায়তা চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মাধ্যমে এ ধরনের যোগাযোগের কথা বলা হয়েছে।
তবে এখানেও সতর্ক থাকা দরকার। ঘটনাটি একটি বিষয় স্পষ্ট করছে। সৌদি আরব নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভর করছে না। পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুরনো সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। প্রয়োজন হলে অন্য দেশের গোয়েন্দা সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদন এসেছে।
আসল পরীক্ষা সামনে :
মক্কার কাছে ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা হয়তো এই সংকটের শেষ নয়। বরং সামনে আরো কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যদি সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা বাড়ে, তাহলে রিয়াদকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই প্রতিক্রিয়া সীমিত রাখবে, নাকি নতুন মক্কা চুক্তির অংশীদারদের আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তার জন্য ডাকবে। আর তখন পাকিস্তান ও তুরস্ককেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা ঠিক কোথায় যেতে প্রস্তুত।
এই মুহূর্তে মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই চুক্তির ভাষা নয়। প্রশ্ন হলো, সংকট আরো বাড়লে তিন দেশের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব সামরিক সহযোগিতায় রূপ নেবে। মক্কার কাছে ড্রোনটি ভূপাতিত হয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে যে প্রশ্নটি উঠে এসেছে, সেটির উত্তর এখনো আকাশে ঝুলছে।
