পশ্চিমাদের মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের যত বাহিনী
মনস্তাত্বিক ও ছায়া যুদ্ধ থেকে এখন সরাসরি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ইরান ও ইসরাইল। যে কোনো সময় সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে দেশ দু'টি। যুদ্ধে কে জিতবে তা নিয়ে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে দু’পক্ষের হিসাব-নিকাশ। একদিকে দখলদার ইসরাইলের সাথে আছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য-সহ পশ্চিমা দেশগুলো। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে রয়েছে ইরান সমর্থিত প্রায় এক ডজন বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনী। এসব সশস্ত্র বাহিনীকে বহুদিন ধরেই ইসরাইল ও পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তৈরি করেছে তেহরান। ইরান সমর্থিত সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে পশ্চিমারা দেখে দেশটির প্রক্সি ফোর্স হিসেবেই। আজকের প্রতিবেদনে আমরা জানবো ইরানের প্রক্সি ফোর্সগুলোর সামরিক শক্তি সম্পর্কে।
ইরানের প্রক্সি ফোর্সগুলোর মধ্যে তুলনামূলক শক্তিশালী হচ্ছে- লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি, গাজার হামাস ও ইসলামিক জিহাদ। এছাড়া সিরিয়া ও ইরাকেও আছে একাধিক ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী।
লেবাননের হিজবুল্লাহ
হিজবুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যের সব থেকে শক্তিশালী ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী। এটিই ইরানের নিজ সীমান্তের বাইরে প্রথম কোনো প্রক্সি বাহিনী। ১৯৮০’র দশকে প্রথম দিকে লেবাননে যাত্রা শুরু করে হিজবুল্লাহ। সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনীতিতেও ব্যাপক অংশগ্রহন আছে গোষ্ঠিটির। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে লেবাননের রাজনীতিতে প্রভাব রেখে চলেছে হিজবুল্লাহ।
পশ্চিমাদের ধারণা মতে, গত ৩০ বছরে দেড় লাখেরও বেশি রকেট মজুদ করেছে হিজবুল্লাহ। এর মধ্যে কিছু আছে স্বল্প-পাল্লার। এগুলো দিয়ে নিয়মিত ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে হামলা চালায় তারা। সংগঠনটির কাছে আছে দূরপাল্লার মিসাইল বা ক্ষেপনাস্ত্র। এখন হিজবুল্লাহর মিসাইলের আওতায় গোটা ইসরাইল। এমনকি তাদের মিসাইলগুলো দিয়ে সুনির্দিষ্ট টার্গেটেও হামলা চালানো সম্ভব। পাশাপাশি হিজবুল্লাহ’র আছে কয়েক হাজার ড্রোন। এগুলো দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলে একাধিক হামলা চালায় তারা। হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ’র দাবি, এক লাখ প্রশিক্ষিত যোদ্ধা আছে তাদের।
ইয়েমেনের হুতি
ইরানপন্থি ইয়েমেনের হুতিরা নিজেদেরকে আনসারুল্লাহ নামে পরিচয় দেয়। ইয়েমেনে আনসারুল্লাহ বা হুতিদের উত্থান ২০১৫ সালে। সে সময় থেকেই ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে তারা। বর্তমানে রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে হুতি। বিশেষ করে লোহিত সাগরে কৌশলগত বাব এল মান্দেব প্রণালী এবং এডেন ও হোদেইদাহ’র মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর-বন্দর তাদের নিয়ন্ত্রণে। ২০১৫ সালে হুতিদের উৎখাতে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালায় সৌদি আরব এবং অন্যান্য আরব দেশ। তবে হুতিদের প্রতিরোধে ব্যর্থ হয় পশ্চিমা সমর্থিত সৌদি কোয়ালিশন। কয়েক ব্রিগেড সেনা আহত বা নিহত হয় হুতিদের হাতে।
ইরান থেকে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন প্রযুক্তি পায় ইয়েমেনের হুতি বা আনসারুল্লাহ। পাশাপাশি নিজস্ব প্রযুক্তির দূর-পাল্লার মিসাইল ও ড্রোন উৎপাদন করে তারা। হুতিদের আছে নিজস্ব ক্রুজ মিসাইল। গত ৭ অক্টোবর ইসরাইল-গাজা যুদ্ধ শুরুর পর আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের এ সশস্ত্র গোষ্ঠি। লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী পশ্চিমা জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালায় তারা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুতিদের মিসাইল সক্ষমতা বেড়েছে বহুগুন। ইসরাইলের যে কোনো অংশে আক্রমণ করার ক্ষমতা রয়েছে তাদের। গোষ্ঠীটিকে অর্থায়ন থেকে শুরু করে অস্ত্র সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ দেয় ইরান।
ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সক্রিয় দুই সশস্ত্র গোষ্ঠী হচ্ছে হামাস ও ইসলামিক জিহাদ। ইসরায়েলকে প্রতিরোধে আরব সুন্নী এ দুটি বাহিনীকে সার্বিক সহযোগিতা দেয় ইরান। ইসরায়েল দাবি করে, ইরানের সমর্থনে ২০২৩ সালে ৭ অক্টোবর হামলা চালায় হামাস। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের প্রক্সি বাহিনী হিসেবে পরিচিতি পায় এ দু’টি সংগঠন। ফিলিস্তিনের গাজায় কয়েক হাজার রকেটের মজুদ ছিল তাদের। তবে গত ছয় মাস ধরে ইসরাইলের অব্যাহত হামলায় সে সংখ্যা অনেক কমে আসে। তবুও যুদ্ধ অব্যাহত রাখে গাজার এ সশস্ত্র যোদ্ধারা।
ইরাক-সিরিয়ায় ইরানপন্থি বাহিনী
ফিলিস্তিন, লেবানন, ইয়েমেনের পাশাপাশি ইরাক ও সিরিয়ায় বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে ইরানের। ১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকে ইরাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন ও সহায়তা করে আসছে ইরান। ইরাকের সশস্ত্র বাহিনীগুলোর নেতা হাদি আল-আমিরি এবং আবু মাহদি আল-মুহান্দিস ছিলেন ইরানের সবচেয়ে বেশি অনুগত। তাদের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয় ইরানের আইআরজিসি বাহিনী।
২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সামরিক অভিযানের পর থেকে দেশটিতে শিয়া বাহিনীগুলোকে একত্রিত করতে শুরু করে ইরান। সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুর পর ইরাকে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা পূরণ করতে শুরু করে এসব বাহিনী। এর মধ্যে আবু মাহদি’র কাতাইব হিজবুল্লাহ, ইরাকের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে অন্য কয়েকটি বাহিনীর সদস্যরা যোগ দেয় তাদের সাথে। ফলে আরও শক্তিশালী হয়ে কাতাইব হিজবুল্লাহ।
২০১৪ সালে সুন্নিপন্থী উগ্র সংগঠন ইসলামিক স্টেট- আইএস ইরাকের বিশাল এলাকা দখল করে নিলে তাদের মোকাবিলায় আরও বেশ কয়েকটি শিয়া বাহিনীর সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে সব থেকে শক্তিশালী হলো হারকাত হিজবুল্লাহ আল-নুজাবা। একই সময়ে ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স’ নামে আরেকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী তৈরি করে ইরান। এর সদস্য সংখ্যা এক লাখের বেশি।
শুধু ইরাক নয়, সিরিয়াতেও সক্রিয় রয়েছে ইরানপন্থি বাহিনীগুলো। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতায় রাখতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করে ইরান। তারই অংশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিয়াদের এনে নতুন কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী সৃষ্টি করে তেহরান। এমনকি আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকেও অনেক যোদ্ধা অর্থের বিনিময়ে এসব বাহিনীতে যোগ দেয়।
ইসরাইলকে চাপে রাখতে ২০১৮ সাল থেকে গোলান মালভূমির কাছে সামরিক ঘাটি তৈরি করতে শুরু করে এসব বাহিনীগুলো। তবে সিরিয়ায় থাকা বাহিনীগুলো অন্যান্য ইরানী প্রক্সি ফোর্সের তুলনায় কিছুটা দুর্বল। তবুও দেশটি অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ছোট ছোট হামলা চালিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয় তারা। ইরানের আইআরজিসির নির্দেশনা ও পরামর্শ অনুযায়ী পরিচালিত হয় এই বাহিনীগুলো।
