জলদস্যুদের কবল থেকে যেভাবে এমভি রুয়েনকে উদ্ধার করে ভারতীয় স্পেশাল ফোর্স
প্রায় ৪০ ঘণ্টার রোমহর্ষক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবল থেকে মাল্টার একটি জাহাজ উদ্ধার করেছে ভারতীয় স্পেশাল ফোর্স। এসময় জাহাজে থাকা ৭ জন ক্রুকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। সেই সাথে আটক করা হয় ৩৫ জন জলদস্যুকে। শুক্র ও শুনিবার জুড়ে চলা এই উদ্ধার অভিযানকে ভারতীয় স্পেশাল ফোর্সের পেশাদারিত্বের পরিচয় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
মাল্টার পতাকাবাহী জাহাজ এমভি রুয়ান প্রায় তিন মাস জলদস্যুদের কব্জায় ছিল। গত বছর ডিসেম্বরে সোমালিয়ান উপকূল থেকে জাহাজটি ছিনতাই করে জলদস্যুরা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়, জাপানিজ এবং স্প্যানিশ কিছু যুদ্ধজাহাজ নজর রাখছিলো জাহাজটির দিকে। সিএনএন ও ডয়চে ভেলে সূত্রে জানা যায়, গত সপ্তাহে জাহাজটি সোমালিয়ান জলসীমা থেকে বের হয়ে আসে। ক্রুদের জিম্মি করে জলদস্যুরাই এ সময় জাহাজ পরিচালনা করছিলো। ধারণা করা হয়, তারা গভীর সাগরে আরো কিছু জাহাজ ছিনতাইয়ের জন্য তৈরি হচ্ছিলো। এমন সময় জাহাজটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় পৌঁছালে ভারতীয় নৌবাহিনী অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়।
ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ আইএনএস কলকাতা থেকে এই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া হয়। প্রথমে তারা ড্রোনের মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে জাহাজটি সশস্ত্র জলদস্যুরা পরিচালনা করছে। এক পর্যায়ে ড্রোনটিকে গুলি করে ধ্বংস করে জলদস্যুরা। জবাবে আইএনএস কলকাতা পালটা আক্রমণ করে জাহাজটিকে। এতে এমভি রুয়েন চলাচলের ক্ষমতা ও দিক হারিয়ে ফেলে। জলদস্যুদের আত্মসমর্পনের নির্দেশ দেয় আইএনএস কলকাতা। সেইসাথে বিমানবাহিনীর একটি সি-১৭ বিমানে দিল্লি থেকে উড়িয়ে আনা হয় স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডোদের। তারা প্যারাস্যুটের মাধ্যমে জাহাজে অবতরণ করে ক্রুদের উদ্ধার ও জলদস্যুদের আটক করেন।
পুরো অভিযানে, একটি রণতরি, একটি টহল জাহাজ, ড্রোন, সি-১৭ বিমান ও একটি নজরদারি বিমান ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানায় ভারতীয় নৌবাহিনী। উদ্ধার অভিযানের জন্য ভারতের কাছে কৃতজ্ঞতা পোষণ করেছেন বুলগেরিয়ান নেতারা এবং প্রেসিডেন্ট রুমেন রাদেভ। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, এমভি রুয়েন উদ্ধারের জন্য আমরা নরেন্দ্র মোদি এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর কাছে কৃতজ্ঞ।
সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগরে হুথি জলদস্যুদের আক্রমণে সাগরে বেশ গরম হাওয়া বিরাজ করছে। এই জলদস্যুদের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য বড়সড় হুমকি হিসেবেই ধরেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এমন অবস্থায় ভারতীয় নৌবাহিনীর এই উদ্ধার অভিযান বেশ সাড়া ফেলেছে বিশেষজ্ঞদের কাছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক জন ব্রাডফোর্ড বলেন, এই সফল অভিযান ভারতীয় নৌবাহিনীকে একটি টপ-ক্লাস বাহিনী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাদের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতারও পরিচয় দিয়েছে এই অভিযান। কমান্ডো, রণতরি, ড্রোনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে অভিযানটিতে, ফলে ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা গেছে।
সাবেক মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও বিশ্লেষক কার্ল স্যুস্টার মন্তব্য করেন, এই অভিযান ভারতীয় নৌবাহিনী ও দিল্লির মেরিন কমান্ডো ফোর্স, “MARCOS” এর পেশাদারিত্বের পরিচয় দেয়। তারা যথেষ্ট দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সেই সাথে আরো বলেন, ভারতীয় স্পেশাল ফোর্সের প্রশিক্ষণ মূলত ব্রিটেনের স্পেশাল ফোর্স “SAS” এর প্রশিক্ষণের আদলে তৈরি। মোট অংশগ্রহণকারীর মাত্র ১০-১৫ শতাংশ কমান্ডো হিসেবে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেন।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রধির জাসওয়াল এক ব্রিফিং–এ বলেন, এই অঞ্চলে নৌ নিরাপত্তা আমাদের কাছে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সাগরে চলমান অস্থির অবস্থা অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকির বিষয়। আমাদের নৌবাহিনী এই বিষয়ে নজর রাখছে।
উল্লেখ্য, ভারত প্রায় ২০ বছর ধরেই আন্তর্জাতিক নৌসীমায় বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে আসছে। চলমান আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল রুটে অস্থিরতার কথা বিবেচনায় ভারতীয় নৌবাহিনীকে আবারো কোন অভিযানে ডাকা হতে পারে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
