পাইলোস ট্র্যাজেডি: অবশেষে বিচারের মুখে গ্রিসের ১৭ কোস্টগার্ড
দুই বছর অপেক্ষার পর অবশেষে গ্রিসের পাইলোস উপকূলে ভয়াবহ নৌকাডুবির ঘটনায় ১৭ কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেছে দেশটির নৌ আদালত। ভূমধ্যসাগরের সর্বশেষ দশকের সবচেয়ে বড় অভিবাসী দুর্ঘটনার পর তদন্তে এমন অগ্রগতি সামনে এসেছে।
২০২৩ সালের ১৪ জুন গভীর রাতে গ্রিসের উপকূল ঘেঁষা আন্তর্জাতিক জলসীমায় ডুবে যায় 'আদ্রিয়ানা' নামের একটি মাছধরা নৌকা। নৌকাটিতে ছিল প্রায় ৭৫০ অভিবাসনপ্রত্যাশী—যার মধ্যে মাত্র ১০৪ জন প্রাণে বেঁচে যান। বাকি ৬৫০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়, যাদের অনেকেই ছিলেন নারী ও শিশু, আর তারা ছিলেন নৌকার নিচের তলায়।
গ্রিসের পিরেয়াস নৌ আদালতের উপ-প্রসিকিউটর জানান, অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন কোস্টগার্ড জাহাজ-এর অধিনায়ক, যিনি 'জাহাজডুবির কারণ’ হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে 'কমপক্ষে ৮২ জনের মৃত্যুর দায়' প্রমাণের মতো যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে বলে জানানো হয়—এই সংখ্যা উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের সমান।
এছাড়াও, কোস্টগার্ডের তৎকালীন প্রধান, জাতীয় উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্রের সুপারভাইজরসহ আরও চার জনকে 'মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগে' অভিযুক্ত করা হয়েছে। অধিনায়কের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ হলো 'সমুদ্র পরিবহন ব্যবস্থায় বিপজ্জনক হস্তক্ষেপ' এবং 'সাহায্য না করার অপরাধ'। নৌকায় থাকা অন্যান্য কোস্টগার্ড সদস্যরা ‘সহযোগিতার দায়ে’ অভিযুক্ত।
গ্রিক কর্তৃপক্ষ বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল। তবে ঘটনার পর থেকেই বিবিসিসহ একাধিক তদন্তে তাদের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে আসে। ঘটনার দিন কোস্টগার্ডের জাহাজ ১৫ ঘণ্টা ধরে অভিবাসীদের নৌকাটি অনুসরণ করছিল, কিন্তু বিপদে থাকার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নৌকাটিকে সময়মতো উদ্ধার করা হয়নি।
নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং বেঁচে ফেরা অভিবাসীরা জানান, গ্রীক কোস্টগার্ড নৌকাটিকে দড়ি দিয়ে টানতে গেলে ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে যায় এবং ডুবে যায়। বেঁচে যাওয়া সিরীয় নাগরিক মোসাব বলেন, “ওরা বাঁ দিক থেকে দড়ি লাগায়, সবাই ডানদিকে গিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করতে চায়, কিন্তু গ্রীক জাহাজ হঠাৎ দৌড় দেয়—আর তখনই উল্টে যায় আমাদের নৌকা।”
আরেকজন বেঁচে যাওয়া সিরীয়, আহমাদ বলেন, কোস্টগার্ড সদস্যরা বন্দরে নামানোর পর মুখ বন্ধ রাখতে বলে। “ওরা বলেছিল, ‘তুমি বেঁচে আছো, এতেই খুশি থাকো। কী হয়েছে তা নিয়ে বেশি কথা বলো না।’”
দুর্ঘটনায় নিহত ও বেঁচে যাওয়া অভিবাসীদের পক্ষে কাজ করা যৌথ আইনি দল একে “ন্যায়বিচারের পথে একটি বড় পদক্ষেপ” বলে উল্লেখ করেছে। তারা জানিয়েছে, অভিযুক্ত ১৭ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ গঠন বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে নৌ আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগ। এরপর সিদ্ধান্ত হবে—তাদের পূর্ণাঙ্গ বিচারে পাঠানো হবে, না কি অভিযোগ খারিজ করা হবে।
গ্রিক সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তারা সর্বদা মানবাধিকার সম্মান করে এবং গত এক দশকে দুই লক্ষাধিক মানুষকে সাগর থেকে উদ্ধার করেছে। তবে পাইলোস ট্র্যাজেডির পর থেকে আন্তর্জাতিক মহলে তাদের নিরপেক্ষতা ও মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে জোর প্রশ্ন উঠেছে।
এই ঘটনার পূর্ণ বিচার ও দায়ীদের শাস্তির মধ্য দিয়েই হয়তো শেষ হবে ভূমধ্যসাগরে ভেসে আসা সেই কান্নার গল্প—যেখানে জীবন বাঁচানোর দায়িত্বে থাকা মানুষদের বিরুদ্ধেই উঠেছে মৃত্যুর অভিযোগ।
