মলে রক্ত: কারণ, লক্ষণ ও কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
সংগৃহীত
মলত্যাগের সময় রক্ত দেখা গেলে অনেকেই বিষয়টি অর্শ বা পাইলস ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়ার পেছনে অর্শ ছাড়াও পায়ুপথে ফাটল, অন্ত্রের সংক্রমণ, প্রদাহ, আলসার, পলিপসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর রোগেরও লক্ষণ হতে পারে।
রক্তের রং, পরিমাণ, মলের সঙ্গে রক্ত মিশে আছে কি না এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ রয়েছে কি না—এসব তথ্য সম্ভাব্য কারণ বুঝতে চিকিৎসককে সহায়তা করে।
মলত্যাগের পর টিস্যু বা মলের ওপর উজ্জ্বল লাল রক্ত দেখা গেলে অনেক সময় পাইলস বা পায়ুপথে ফাটলের মতো সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। শক্ত মল বের করার সময় পায়ুপথে ছোট ক্ষত হলেও এমন রক্তপাত হতে পারে।
অন্যদিকে গাঢ় লাল বা মেরুন রঙের রক্ত অন্ত্রের কিছু অংশ থেকে রক্তপাতের ইঙ্গিত দিতে পারে। আর কালো, আঠালো বা পিচের মতো মল সাধারণত পরিপাকতন্ত্রের ওপরের অংশে রক্তপাতের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে শুধু রক্তের রং দেখে রোগের কারণ নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
পাইলস বা অর্শ: মলদ্বারের আশপাশের শিরা ফুলে গেলে পাইলস হতে পারে। মলত্যাগের সময় চাপ প্রয়োগ করলে উজ্জ্বল লাল রক্ত দেখা দিতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্য ও দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকার অভ্যাসও সমস্যা বাড়াতে পারে।
পায়ুপথে ফাটল: শক্ত মল বা কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে পায়ুপথের চামড়ায় ছোট ফাটল তৈরি হতে পারে। সাধারণত মলত্যাগের সময় তীব্র ব্যথা ও অল্প পরিমাণ উজ্জ্বল লাল রক্ত দেখা যায়।
অন্ত্রের সংক্রমণ: কিছু ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা পরজীবীর সংক্রমণে ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও রক্তমিশ্রিত মল হতে পারে। জ্বর বা বমিও থাকতে পারে।
প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ: আলসারেটিভ কোলাইটিস ও ক্রোনস ডিজিজের মতো রোগে অন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হতে পারে। এর ফলে মলে রক্ত বা শ্লেষ্মা, পেটব্যথা ও বারবার পায়খানা হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অন্ত্রের পলিপ বা ক্যানসার: কোলনে পলিপ বা কোলোরেক্টাল ক্যানসারের কারণেও মলে রক্ত দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে রক্তপাত, মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন, অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা রক্তস্বল্পতার মতো লক্ষণ থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পাকস্থলীর আলসার: পাকস্থলী বা ক্ষুদ্রান্ত্রের শুরুর অংশে আলসার হলে কখনো কখনো পরিপাকতন্ত্রে রক্তপাত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মল কালো ও আঠালো হয়ে যেতে পারে।
মলে রক্ত যাওয়ার পাশাপাশি নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে—
পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য, মলে শ্লেষ্মা, পায়ুপথে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া, দুর্বলতা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং শ্বাসকষ্ট।
দীর্ঘদিন অল্প অল্প করে রক্তক্ষরণ হলেও শরীরে আয়রনের ঘাটতি ও রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে।
মলে সামান্য রক্ত দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে বিষয়টি বারবার হলে অবহেলা করাও ঠিক নয়। প্রচুর রক্তপাত, কালো পিচের মতো মল, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অনুভূতি, দ্রুত হৃদস্পন্দন, তীব্র পেটব্যথা কিংবা শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
এ ছাড়া কয়েকদিন ধরে রক্তপাত চলতে থাকলে, বারবার রক্ত দেখা গেলে, মলত্যাগের অভ্যাস হঠাৎ বদলে গেলে বা অকারণে ওজন কমতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চিকিৎসক প্রথমে রোগীর বয়স, রক্তপাতের ধরন, মলের রং, কতদিন ধরে সমস্যা হচ্ছে এবং অন্যান্য উপসর্গ সম্পর্কে জানতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা, মল পরীক্ষা, পায়ুপথের পরীক্ষা, কোলনোস্কোপি বা ওপরের পরিপাকতন্ত্রের এন্ডোস্কোপির মতো পরীক্ষা করা হতে পারে।
সব রোগীর জন্য একই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। রোগীর লক্ষণ ও ঝুঁকি বিবেচনা করেই চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
মলে রক্ত যাওয়ার চিকিৎসা নির্ভর করে মূল কারণের ওপর। পাইলস বা পায়ুপথের ফাটলের ক্ষেত্রে কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত পানি পান, খাদ্যতালিকায় আঁশ বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে।
অন্যদিকে সংক্রমণ, প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ, আলসার, পলিপ বা অন্য কোনো গুরুতর সমস্যার ক্ষেত্রে আলাদা চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
তাই মলে রক্ত দেখলে নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়ার বদলে কারণ শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রক্তপাত বারবার হলে বা সঙ্গে অন্য উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
