কেন একা থাকেন দিলারা জামান
দিলারা জামান। নামের সাথে বিশেষণের কোনো প্রয়োজনই নেই। বহু কালজয়ী নাটকে অভিনয় করেছেন পাশাপাশি একাধিক সিনেমায়ও কাজ করেছেন তিনি। দীর্ঘ অভিনয়ের ক্যারিয়ারে অসংখ্য নাটক-সিনেমায় অভিনয় করে, শুধু যে দর্শকের হৃদয়ের জায়গা করে নিয়েছেন তা নয়। মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছেন তার সহজাত বিনয়ী স্বভাব ও আচরণেও। করেতেন শিক্ষকতা। একসময় শিক্ষকতা ছেড়ে অভিনয়কেই পেশা হিসেবে ধ্যান-জ্ঞান করেছেন তিনি।
জীবন্ত কিংবদন্তী একুশে পদকপ্রাপ্ত গুণী এই অভিনেত্রীর শুরুটা ১৯৬৬ সালে, ত্রিধারা নাটক দিয়ে। পরে সকাল সন্ধ্যা ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেন। একে একে এইসব দিনরাত্রি (১৯৮৫), অয়োময় (১৯৮৮), আজ আমাদের ছুটি (১৯৯২), হিমু (১৯৯৪), নক্ষত্রের রাত (১৯৯৫), সমুদ্রবিলাস প্রাইভেট লিমিটেড (১৯৯৯), ভোরের ফুল (২০১৪), ভালোবাসা ১০১ (২০১৪), থ্রি সিস্টার্স (২০১৬), ফুল আর কাঁটা (২০১৬), গুগল সব জানে (২০১৬), কালো আল্পনা (২০১৬), না হবে না কিছুতেই (২০২১) ইত্যাদি নাটকে অভিনয় করে টিভি নাটকে নিজের আসন পাকাপোক্ত করেন অভিনয় গুণে। ৮০ বছর বয়সেও ক্লান্তি যেনো ছুঁতেই পারেনি তাকে। এই বয়সেও গ্ল্যামারাস লুকিং তাঁর। অভিনয়ের মাধুুর্যতা দিয়ে এখনও রাজত্ব করছেন ভক্ত-অনুরাগীদের মনে।

সম্প্রতি দ্য নিউজের এক সাক্ষাৎকারে প্রাণ খুলে তুলে ধরলেন নিজের অভিজ্ঞতা, অর্জনের গাঁথা। বেজেছে কিছু আক্ষেপেরও সুর।
এখন নাটক- সিনেমায় বেশি একটা দেখা যায় না কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে দিলারা জামান বলেন, আগের মতো ব্যস্ততা নেই। স্ক্রিপ্টেও নেই আমাদের মানানসই চরিত্র। তিন-চারজনের গল্পে শেষ হচ্ছে নাটকগুলো। এখন নাটকে যেই ধরনের চরিত্র দর্শক পছন্দ করছে ঐ ধরনের চরিত্রে তো আমি অভিনয় করছি না। বলেন, আমরা তো যে কোন চরিত্রে অভিনয় করতে পারি না, রুচি এবং বয়সেরও একটা ব্যাপার আছে। তাছাড়া, চারদিকে এখন তরুণদের জয় জয়কার। তাদের পছন্দে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
ধারাবাহিক অয়োময়ো নাটকের সেই জমিদার মাতা দিলারা জামান আরও বলেন, সময়ের প্রয়োজনে পরিবারগুলো আগের মতো নেই। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। ‘আমরা’ থেকে ‘আমি’কে নিয়ে ব্যস্ততা সবার। এর প্রভাব নাটক-সিনেমায়ও পড়ছে ব্যাপক।
এ অভিনেত্রী আক্ষেপ করে দ্য নিউজকে আরো বলেন, আগের মতো কষ্ট করে অভিনয় করতে হয় না এ হালের তারকাদের। রাতারাতি তারকা বনে যাচ্ছে অনেকেই। নতুন প্রজন্মের তারকা, কলাকুশলীদের সময় জ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন তুলেন তিনি। স্ক্রিপ্ট না পড়েই নেমে পড়ছে শুটিংয়ে। রাতারাতি ভাইরালও হচ্ছে। জানিনা এ থেকে উত্তরণের উপায় কী!

রাজধানীর উত্তরায় একটি বাসায় একা থাকেন দিলারা জামান। দুই মেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা প্রবাসী। মেয়েরা তাঁকে কাছে রাখতে চাইলেও তিনি দেশ ছাড়তে চান না। কিন্তু কেন?
এমন প্রশ্নের উত্তরে অভিনেত্রী বলেন, বিদেশে একজন প্রবীণ নাগরিক হিসেবে চিকিৎসা, যাতায়াতসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু সেটা পরদেশ। অশিতিপর এই অভিনেত্রীর দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি ভালবাসা আর অভিনয়ের জন্য হৃদয়ের টানকে তিনি উপেক্ষা করতে পারেন না। আবেগ-আপ্লুত হয়ে বলেন, তার প্রতি অনুরাগীদের যে মায়া-মমতা তা আর বিদেশ কই! জানান, দু’বছর ছিলেনও শীতের দেশে। দেশের টানে বিদেশে আর যাবেন না বলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দিলারা জামান।
অনবদ্য অভিনয়ের জন্য একুশে পদক ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ক্যারিয়ারের দীর্ঘ পথচলায় পেয়েছেন অসংখ্য অনুরাগীদের ভালোবাসা। তবে প্রবীণ দুঃস্থ শিল্পীদের বেহাল অবস্থা ভাবায় তাকে প্রতিনিয়ত। তাদের জন্য কিছু করার দায় অনুভব করেন দিলারা জামান।
দিলারা জামান সুস্থতায় বাঁচুন, আমাদের নাট্যাঙ্গনকে আরো সমৃদ্ধ করবেন এমনটাই আশা তাঁর ভক্তদের।
