চট্টগ্রামে অস্ত্রধারী এই ক্যাডার সম্পর্কে যা জানা গেলো
চট্টগ্রামের সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে ৩ জনই ছিলেন গুলিবিদ্ধ।এদের তিনজনই যুবলীগ - ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন।আহতদের অধিকাংশও ছিলেন গুলিবিদ্ধ। সংঘর্ষের সময় বেশ কয়েকজনকে প্রকাশ্যে গুলি করতে দেখা যায়।তবে সেখানে সাংবাদিকদের ফুটেজ নিতে নিষেধ করে দেন তারা।এরমধ্যে ৪ জনে অস্ত্র হাতে দৌড়াদৌড়ি করার ভিডিও এসেছে দ্যা নিউজের হাতে।
গুলি করা সেই চার ব্যক্তির মধ্যে দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। একজন মো. ফিরোজ, তিনি মহানগর যুবলীগের নেতা। অন্যজন মো. দেলোয়ার স্বেচ্ছাসেবক লীগের সংগঠক। ফিরোজ রিভলবার নিয়ে এবং দেলোয়ার শটগান নিয়ে গুলি করেন। বাকি দুজনকে রিভলবার নিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ধুসর রঙের পোলো-টিশার্ট পরা এক যুবক পিস্তল হাতে পায়চারি করছেন। এ সময় আশেপাশের মানুষকে শাসাতে দেখা যায় তাকে, আবার অন্য একজনের কাছ থেকে গুলি নিয়ে পিস্তলেও ভরতে দেখা যায়। হেলমেট পড়া এই যুবকের নাম মোহাম্মদ ফিরোজ। তিনি যুবলীগের নেতা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যুবলীগের ফিরোজ একসময় শিবিরের ক্যাডার ছিলেন। মুরাদপুরের ত্রাস ছিলেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় একাধিক হত্যা মামলা রয়েছে। সর্বশেষ চট্টগ্রামের আলোচিত স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিন হত্যা মামলার অন্যতম আসামি এই যুবলীগ নেতা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান বেলা ২টা থেকে ষোলোশহর স্টেশনে অবস্থান নেন ছাত্রলীগ–যুবলীগের কর্মীরা। অন্যদিকে মুরাদপুরে অবস্থান নেন কোটা আন্দোলনকারীরা। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে দুই নম্বর গেট থেকে একটি মিছিল যায় মুরাদপুরের দিকে। কোটা আন্দোলনকারীরা ধাওয়া দিলে পিছু হটেন তাঁরা। কিছুক্ষণ যুবলীগের একটি মিছিল থেকে গুলি করতে দেখা যায় ফিরোজকে। একপর্যায়ে গুলি থামিয়ে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘গুলি দে, গুলি দে’। কিছুক্ষণ পর একজন গুলি এনে দেন তাঁকে। গুলি ভরে আবারও শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন ফিরোজ।
জানা যায়,২০১১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে নগরের প্রবর্তক মোড়ে একটি রোগ নির্ণয়কেন্দ্র থেকে সন্ত্রাসীরা ১১ লাখ টাকা লুট করে। মারধর করা হয় একজন চিকিৎসককে। ডাকাতির ঘটনার পরদিন নগরের বায়েজিদ থানার কয়লাঘর এলাকা থেকে সন্ত্রাসী মো. ফিরোজ ও মনিরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ফিরোজের পাঁচলাইশের আস্তানা থেকে ১২ রাউন্ড গুলিভর্তি দুটি বিদেশি পিস্তল, তিনটি গুলিসহ একটি ম্যাগাজিন, একটি একনলা বন্দুক, একটি বন্দুকের ব্যারেল, তিনটি কার্তুজ, দুটি চাপাতি উদ্ধার করে পুলিশ।
ফিরোজ ওই সময় পুলিশ হেফাজতে বলেছিলেন, ‘অস্ত্রগুলোর মালিক সন্ত্রাসী ম্যাক্সন ও সরওয়ার। তাঁরা তাঁর কাছে এগুলো রাখতে দিয়েছিলেন।’
পুলিশ জানায়, চট্টগ্রামের কথিত শিবির ক্যাডার সরওয়ার ও ম্যাক্সনের সঙ্গে ফিরোজ চাঁদাবাজি, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। ২০১১ সালে অস্ত্রসহ ধরা পড়ার পর ২০১৩ সালের ১৯ জুলাই রাতে তিন রাউন্ড গুলিভর্তি নাইন এমএম পিস্তলসহ আবারও ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এদিকে আজকে শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলির বিষয়ে জানতে চাইলে ফিরোজ বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন,আমি অস্ত্র নিয়ে যাইনি।অস্ত্রধারী ব্যক্তিটি কে তা আমি জানিনা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটা ছবিতে আরও দুইজনকে প্রকাশ্যে গুলি করতে দেখা যায়।এদের মধ্যে একজন নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের পদধারী নেতা মোহাম্মদ দেলোয়ার।তিনি কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক নেতা হেলাল আকবরের অনুসারী বলে পরিচিত।
জানা যায়, শিক্ষার্থীরা বিকেল সাড়ে ৩ টায় নগরের ষোলশহর স্টেশনে বিক্ষোভ করার কর্মসূচি দিয়েছিল।তবে দুপুর ২ টার দিক নগর ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সেক্রেটারি নুরুল আজিম রনির নেতৃত্বে সেখানে যুবলীগের কর্মীরা অবস্থান নেন।একপর্যায়ে শিক্ষার্থী বিকেল ৩ টার দিকে পার্শ্ববর্তী মুরাদপুর মোড়ে জড়ো হতে থাকলে সেখানে হামলা চালায় যুবলীগ - ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।সেখানে তারা অস্ত্র হাতে গুলিবর্ষণের পাশাপাশি ককটেল বিষ্ফোরণ ঘটায়।এই ঘটনায়ও নেতৃত্বে ছিলেন নুরুল আজিম রনি।এই এলাকায় সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতার প্রভাব রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা জানান,মূলত রনির নেতৃত্বেই শুরুতে নগরের মুরাদপুরে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা হয়।পরে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। এক পর্যায়ে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর ধাওয়ায় পিছু হটে যুবলীগ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।সংঘর্ষের যুবলীগের নেতারা প্রকাশ্যে গুলি চালিয়েছেন।তাদের গুলিতেই ৩ জন নিহত হয়েছেন
তারা বলেন,আমাদের পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী দুই নম্বর গেইটে অবস্থান নেওয়ার কথা থাকলেও ছাত্রলীগের বাঁধা পেয়ে তা মুরাদপুরে অবস্থান নেই।সেখানেও পুলিশের সামনেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্র হাতে হামলা করেছে। পুলিশের সামনেই তারা এসব করেছে।
সরজমিনে দেখা যায়, ছাত্রলীগ যুবলীগের নেতাকর্মীদের গুলির বিপরীতে শিক্ষার্থীরা বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে।স্থানীয় ছাত্রদল ও শিবিরের কয়েক জনকে শিক্ষার্থীদের সাথে মিলে সংঘাতে জড়াতে দেখা যায়।সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে একজন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ন আহবায়ক।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানান, তারা মুরাদপুর হয়ে অবস্থান কর্মসূচি সফল করতে ষোলশহর এলাকায় যাওয়ার সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা করে। এরপরে তারাও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা হামলা চালায়।তবে তারা ইট পাটকেল মারলেও ছাত্রলীগ যুবলীগ পুলিশের সামনেই অস্ত্র ব্যবহার করেছে।তবে পাশে পুলিশ অবস্থান করলেও তারা কোন ব্যবস্থা নেননি।
চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন বলেন,সংঘর্ষে নিহতদের ৩ জনই গুলিবিদ্ধ। আহতদেরও প্রায় সবার শরীরে গুলি লেগেছে।এদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
এদিকে চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৩ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে।মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) বিকেলে তাদের মোতায়েন করা হয়।
বিজিবি চট্টগ্রাম-৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শাহেদ মিনহাজ ছিদ্দিকী বলেন, চট্টগ্রামে ৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বিজিবি গাড়ি নিয়ে নগরের মুরাদপুর, অক্সিজেন ও পাহাড়তলী এলাকায় টহল দিচ্ছে।
