গাড়িতে গুলি, বাদীকে ‘লাশ ফেলার’ হুমকি, প্রকাশ্যে খুন—কোথায় নিরাপত্তা?
সংগৃহীত ছবি
রাজধানীতে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি, কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে হামলা-লুটপাটের মামলার বাদীকে হত্যার হুমকি, সাংবাদিকদের গাড়ি আটকে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা এবং বরিশাল ও খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড—দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অপরাধের শিকার ব্যক্তি থেকে শুরু করে মামলার বাদী ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। অপরাধ দমনে যৌথ অভিযানও চলছে।
তবে একের পর এক অপরাধের ঘটনায় অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি, রহস্যে পুলিশ
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভোরে রাজধানীর মগবাজারে বিশাল সেন্টার মার্কেটের সামনে পার্কিংয়ে রাখা সংগীতশিল্পী ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক পরিচালক আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। পরে গাড়ির ভেতর থেকে একটি গুলির কার্তুজ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এসে এক ব্যক্তি গাড়িটি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে থাকতে পারেন। ঘটনার সময় আসিফ আকবর মার্কেটের তৃতীয় তলায় নিজের অফিসে ছিলেন। তাঁকে লক্ষ্য করেই গুলি ছোড়া হয়েছিল কি না, কিংবা এর পেছনে ব্যক্তিগত বা পেশাগত বিরোধ রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানান, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের কাজ চলছে। গাড়িটি পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র ধরে তদন্ত করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. আবুল বাশার তালুকদার জানিয়েছেন, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
হামলার পর বাদীকে হুমকি, ‘সবার আগে তোর লাশ পড়বে’
মগবাজারের ঘটনার পাশাপাশি রাজধানীর হাজারীবাগে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয় ও গুদামে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাটের ঘটনাও সামনে এসেছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, হামলাকারীরা নিজেদের শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের লোক পরিচয় দিয়ে জানায়, এখন থেকে জমির ভাড়া তাঁকে দিতে হবে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দুই বছর আগে শিকদার গ্রুপের কাছ থেকে চুক্তির মাধ্যমে জমিটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। হামলাকারীরা কার্যালয় ও গুদামে ভাঙচুর চালিয়ে কয়েক লাখ টাকার পণ্য ও সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় করা মামলায় পুলিশ আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দাবি, হামলার নেতৃত্বে থাকা সাইফুল ও জুয়েল এখনো গ্রেপ্তার হননি।
এর মধ্যেই মামলার বাদী ও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিনকে ফোনে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার রাত ১১টার দিকে তাঁকে ফোন করে শনিবারের মধ্যে সমঝোতা করার কথা বলা হয়। অন্যথায় হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
হুমকিদাতার সঙ্গে আফসারের কথোপকথনের অডিওতে শোনা যায়, ওই ব্যক্তি তাঁকে বলেন, ‘কালকের দিন সময় দিলাম, তোর বাপের সাথে কথা বলে ঝামেলা শেষ করতে বল। না হলে সবার আগে তোর লাশ পড়ে থাকবে।’
হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন জানান, বাদীর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। হুমকির অডিও যাচাই করা হচ্ছে। এ বিষয়টিও মামলার তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
হামলার ঘটনায় মামলা করার পর বাদীকে হত্যার হুমকির বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ, অপরাধের শিকার ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরও যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো ও বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে ভীতি তৈরি হতে পারে।
সাংবাদিকদের গাড়ি আটকে চাঁদা দাবির অভিযোগ
শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে সাংবাদিকদের বহন করা একটি মাইক্রোবাস আটকে পৌরসভার ইজারার টাকা আদায়ের নামে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে যুবদলের সাবেক এক নেতার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত আসাদুজ্জামান বিপ্লব নবীনগর পৌর যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক।
অভিযোগ অনুযায়ী, সংবাদ সংগ্রহের কাজে কয়েকজন টেলিভিশন সাংবাদিক মাইক্রোবাসে করে ধরাভাঙ্গা গ্রামে যাচ্ছিলেন। পথে আলীয়াবাদ মোড়ে গাড়িটি আটকে ইজারার টাকা দাবি করা হয়। পরে বিপ্লব সেখানে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন এবং তাঁদের মারতে উদ্যত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক রাকিবুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকদের গাড়ি থেকে ইজারার টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি ইজারা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান। সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নানও ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তাঁর কোনো ভাতিজা নেই। তিনি পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে ইজারা বাতিল করতে বলেছেন।
এ ঘটনা শুধু চাঁদা আদায়ের অভিযোগ নয়, দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও সামনে এনেছে।
বরিশাল-খুলনায় হত্যাকাণ্ড
দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাতেও। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলায় শুক্রবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে কাওসার হাওলাদার নামের ৩৭ বছর বয়সী এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কাওসার ও তাঁর পরিচিত কয়েকজন পশ্চিম সাতলা এলাকার একটি সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় মাইক্রোবাসে আসা একদল সশস্ত্র ব্যক্তি তাঁদের ওপর হামলা চালায়। প্রাণ বাঁচাতে কাওসার ও রাশেদ আমিন সেতুর নিচে পানিতে লাফ দেন। পরে পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলে হামলাকারীরা সেখানে ঢুকে কাওসারকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ফেলে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ধারণা, পূর্বশত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। হত্যার কারণ নিশ্চিত করা এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
অন্যদিকে, খুলনা নগরীতে ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। জিন্নাহপাড়া এলাকায় খুশি বেগম নামের এক নারীকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাঁর ওপর হামলা হয়ে থাকতে পারে। এর আগে নগরীর মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় তুষার নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
এসব ঘটনায় অপরাধের ধরন, সম্ভাব্য বিরোধ ও হামলাকারীদের পরিচয় আলাদাভাবে তদন্ত করছে পুলিশ। তবে ধারাবাহিক সহিংসতার ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
আইজিপির অঙ্গীকার, চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে
এমন পরিস্থিতিতে শনিবার খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) লাইনসে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও উগ্রবাদবিরোধী কমিউনিটি পুলিশিং সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির।
তিনি বলেন, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে। বিগত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা দূর করাই তাঁদের লক্ষ্য। ৫ আগস্টের পর পুলিশ দৃঢ় মনোবল নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং দায়িত্ব পালন করছে বলেও জানান তিনি।
আইজিপি বলেন, বর্তমান সরকার মাদক ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি ঘোষণা করেছে। মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চলছে এবং তা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কমিউনিটি পুলিশের কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে এ ব্যবস্থার কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে নিরীহ মানুষকে হয়রানি, ভয়ভীতি দেখানো ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে আইনি কাঠামোর মধ্যে কমিউনিটি পুলিশের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
আস্থা ফেরাতে প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ
আইজিপির বক্তব্যে অপরাধ দমন ও জনবান্ধব পুলিশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার স্পষ্ট। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তদন্তে অগ্রগতি, অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, মামলার বাদী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সেই অঙ্গীকারের কার্যকারিতা প্রমাণিত হবে।
বিশেষ করে মামলা করার পর বাদীকে হত্যার হুমকি, প্রকাশ্যে গুলি ছোড়া কিংবা চাঁদা আদায়ের অভিযোগের মতো ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধের শিকার ব্যক্তি যেন ভয়ভীতি ছাড়াই আইনের আশ্রয় নিতে পারেন, তা নিশ্চিত করাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা দিয়ে সামগ্রিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে এসব ঘটনার দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। জনগণের আস্থা ফেরানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে পুলিশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—অপরাধের বিরুদ্ধে ঘোষিত কঠোর অবস্থানকে মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেওয়া।
