যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্নফাঁস চক্রের ৭ সদস্য গ্রেপ্তার
সংগৃহীত ছবি
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সংঘবদ্ধ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। তাদের কাছ থেকে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক, পরীক্ষার প্রবেশপত্র, সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, আটটি মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন নথি জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মচারী রয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ছায়া তদন্তের ভিত্তিতে ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, উত্তর প্রস্তুত এবং বিভিন্ন চাকরিপ্রার্থীর কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের ২৪২টি শূন্য পদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। সকাল ১১টায় পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও ওই দিন সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।
এ ঘটনায় ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। পরে এসআরবি প্রশ্নপত্রের সম্ভাব্য উৎস, সরবরাহকারী এবং মধ্যবর্তী বিতরণকারীদের শনাক্তে অনুসন্ধান শুরু করে। এসআরবি জানায়, প্রাথমিক তদন্তে রুবেল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের সময় মতিঝিল এলাকা থেকে তাঁকে এবং চক্রের আরও দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন, মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), মো. মফিজুল ইসলাম (২৩) ও মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২)। রুবেল পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর বলে জানিয়েছে এসআরবি। সংস্থাটির দাবি, মফিজুল নিজেও চাকরিপ্রার্থী। এই চক্রের একজনকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর আরও অর্থ উপার্জনের আশায় তিনি চক্রটির সঙ্গে যুক্ত হন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
তাঁদের দেওয়া তথ্য এবং পরবর্তী গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে চক্রের আরও দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫) ও আসাদুল ইসলাম (৩৩)। ইমদাদুলকে উত্তরখান এলাকা থেকে এবং আসাদুলকে এসআরবির আরেকটি ইউনিটের সহায়তায় মিরপুর-১০ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আসাদুল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্নপত্র আদান-প্রদান
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের চ্যাট পর্যালোচনা করে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ ও বিতরণের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে এসআরবি। সংস্থাটির দাবি, চক্রের সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের কার্যক্রম চালাতেন। তাঁদের মোবাইল ফোনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদকে ১৫ অক্টোবর সাভার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে ১৬ অক্টোবর এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীরকে মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসআরবির প্রাথমিক তদন্তের বরাতে জানানো হয়, নূর মোহাম্মদ পরীক্ষার দিন ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটের দিকে একটি সূত্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের একটি স্পষ্ট ছবি পাঠান বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলকে পাঠান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে প্রশ্নপত্র ও উত্তর চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে আসাদুল, রুবেল, মফিজুল ও সুজনের নাম রয়েছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, প্রশ্নপত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে উত্তর তৈরি এবং চাকরিপ্রার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে চক্রটির সদস্যদের মধ্যে পৃথক দায়িত্ব বণ্টন করা ছিল। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এবং এর সঙ্গে আরও কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনায় বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ ও নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষ করে ২৪২টি পদের বিপরীতে ৩ লাখ ১৯ হাজার আবেদনকারীর পরীক্ষাটি স্থগিত হওয়ায় প্রার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এসআরবি জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস, অর্থ লেনদেনের পরিধি এবং চক্রটির সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করার প্রক্রিয়া চলছে।
