আদালতে ছুটতে হবে না, ঘরে বসেই মিলবে পারিবারিক বিরোধের প্রতিকার
সংগৃহীত
পারিবারিক বিরোধের প্রতিকার পেতে আদালতের বারান্দায় দিনের পর দিন অপেক্ষা, মামলার অগ্রগতি জানতে বারবার আদালতে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ছোটাছুটি—এসব ভোগান্তি কমাতে আসছে ডিজিটাল বিচারব্যবস্থার নতুন দিগন্ত। মামলা দায়ের থেকে শুরু করে নিষ্পত্তি পর্যন্ত বিচারিক কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন করার সুযোগ নিয়ে চালু হচ্ছে ই-পারিবারিক আপিল আদালত।
এই ব্যবস্থায় মুঠোফোন কিংবা কম্পিউটারের মাধ্যমে মামলার কার্যক্রমে অংশ নেওয়া, নিজের মামলার তথ্য দেখা এবং অনলাইনে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার সুযোগ পাবেন বিচারপ্রার্থীরা। ফলে বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করার পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রতা কমানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানী ঢাকায় ই-পারিবারিক আপিল আদালতের উদ্বোধন করা হবে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সম্মেলনকক্ষে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
মামলা দায়ের থেকে নিষ্পত্তি—সবই অনলাইনে
ই-পারিবারিক আদালত ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমানো। প্রচলিত ব্যবস্থায় মামলা দায়ের, নথিপত্র জমা, মামলার অগ্রগতি জানা এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে আদালতে যাওয়ার যে চাপ থাকে, ডিজিটাল ব্যবস্থায় তা অনেকটাই কমিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘মামলা দায়ের করা থেকে শুরু করে নিষ্পত্তি পর্যন্ত সমস্ত কার্যক্রম ‘ই-পারিবারিক আদালত’ ব্যবস্থার মাধ্যমে অনলাইনে সম্পন্ন হয়। ফলে, বিচারপ্রার্থীদের এখন আর প্রতিকার পাওয়ার জন্য বারবার আদালতে ছুটতে হবে না বা আইনজীবীদের কাছে বারবার যেতে হবে না। তাদের কেবল ই-পারিবারিক আদালত ব্যবস্থায় নিবন্ধন করতে হবে, সুরক্ষিত পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে লগ-ইন করতে হবে এবং অনলাইনে মামলা দায়ের করতে হবে।’
এ ব্যবস্থায় বিচারপ্রার্থীদের জন্য মামলার তথ্য পাওয়া ও বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যাঁদের পক্ষে বারবার আদালতে যাওয়া কঠিন, তাঁদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হয়ে উঠতে পারে।
নিজের ড্যাশবোর্ডেই মামলার সব তথ্য
ই-পারিবারিক আদালত ব্যবস্থায় নিবন্ধন করে লগইন করার পর বিচারপ্রার্থীরা নিজেদের ড্যাশবোর্ডে মামলার প্রাসঙ্গিক তথ্য দেখতে পারবেন। এতে মামলার অবস্থা জানতে কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে বারবার আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিচারপ্রার্থীরা সিস্টেমে লগইন করার পর নিজেদের ড্যাশবোর্ডে মামলার সব প্রাসঙ্গিক তথ্য দেখতে পারবেন। মুঠোফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমেই বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তাঁর মতে, বিচারকদের হাতে লিখে নথিপত্র তৈরি কিংবা কাগজের নথি সংরক্ষণের প্রয়োজন কমে আসায় মামলার দীর্ঘসূত্রতা হ্রাসে এ ব্যবস্থা ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘সব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালনাগাদ হয় এবং অনলাইন রেজিস্টারে সংরক্ষিত থাকে।’
ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনার ফলে তথ্য সংরক্ষণ ও হালনাগাদ সহজ হওয়ার পাশাপাশি মামলার প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবস্থাপনায়ও সুবিধা তৈরি হতে পারে। তবে এ ব্যবস্থার মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তির সময় কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর।
বিচারক ও আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ
নতুন এ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য বিচারক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনজীবীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা জানান, ই-পারিবারিক আদালত পরিচালনার জন্য চারজন বিচারককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের এক হাজারের বেশি আইনজীবীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে, যাতে তাঁরা ডিজিটাল ব্যবস্থায় বিচারপ্রার্থীদের সহায়তা করতে পারেন।
বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার সফল করতে সংশ্লিষ্ট সবার দক্ষতা ও প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শুধু অনলাইন ব্যবস্থা চালু করলেই হবে না; বিচারক, আইনজীবী ও আদালতের কর্মীদের সমন্বিতভাবে এটি ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।
এ ছাড়া আদালতগুলোকে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি সহায়তা দিতে প্রথমবারের মতো ইন্টার্ন নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়। এতে ডিজিটাল বিচারব্যবস্থা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধানে সহযোগিতা পাওয়া যেতে পারে।
স্মার্টফোন নেই, পড়তে-লিখতে পারেন না—তাঁদের কী হবে?
ডিজিটাল বিচারব্যবস্থার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তিতে সবার সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। বিশেষ করে যাঁদের স্মার্টফোন বা কম্পিউটার নেই কিংবা যাঁরা পড়তে ও লিখতে পারেন না, তাঁদের জন্য অনলাইনভিত্তিক বিচারপ্রক্রিয়া ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে।
এ বিষয়ে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, যেসব বিচারপ্রার্থীর স্মার্টফোন নেই কিংবা যাঁরা পড়তে ও লিখতে পারেন না, তাঁরা সরকারি আইনি সহায়তা বা লিগ্যাল এইড সেবার মাধ্যমে আইনজীবীদের সহায়তা নিতে পারবেন। আইনজীবীরা প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে তাঁদের দিকনির্দেশনা দেবেন।
এ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রযুক্তিগত সুবিধাবঞ্চিত মানুষও ডিজিটাল বিচারব্যবস্থার আওতায় আসার সুযোগ পাবেন। তবে তাঁদের জন্য সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ, সহজলভ্য ও কার্যকর রাখা জরুরি।
নারী ও শিশুর তথ্যের গোপনীয়তা
পারিবারিক বিরোধের মামলায় ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য থাকতে পারে। দাম্পত্য সম্পর্ক, ভরণপোষণ, সন্তানদের দায়িত্ব ও পারিবারিক নানা বিষয় এসব মামলার সঙ্গে জড়িত থাকায় তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের বিষয়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশনা রয়েছে। বিচারপ্রার্থীদের গোপনীয়তা সুরক্ষিত থাকবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
ডিজিটাল ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ লগইন এবং তথ্যের যথাযথ সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নারী ও শিশুর মতো সংবেদনশীল অবস্থানে থাকা বিচারপ্রার্থীদের তথ্য যেন অননুমোদিত ব্যক্তির হাতে না যায়, সে বিষয়ে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ন্যায়বিচারকে আরও সহজলভ্য করার প্রত্যাশা
বিচারপ্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু সময় ও যাতায়াতের খরচ কমানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মানুষের আস্থা। অনলাইনে মামলার তথ্য পাওয়া গেলে বিচারপ্রার্থীদের তথ্যের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। নথিপত্রের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা বিচারিক কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খল করতেও সহায়তা করতে পারে। তবে এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নিরবচ্ছিন্ন সেবা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং সব শ্রেণির মানুষের ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর। যাঁরা সরাসরি অনলাইন ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারবেন না, তাঁদের জন্য বিকল্প সহায়তা চালু রাখাও জরুরি।
ই-পারিবারিক আপিল আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে ডিজিটাল বিচারব্যবস্থার এ উদ্যোগ বাস্তবে কতটা সুবিধা দিতে পারে, তা মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে। যথাযথ বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ ব্যবস্থা বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমানো এবং ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ই-পারিবারিক আদালতের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম: https://efamilycourt.judiciary.gov.bd
