মাদ্রাসার সুপারকে কক্ষে আটকে মারধরের অভিযোগ বিএনপি নেতা ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কুনিয়া চাদপুর দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকদের হাজিরা রেজিস্টার সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির সুপারিনটেনডেন্ট আবু বকর সিদ্দিককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসার একটি কক্ষে তাকে আটকে দরজা বন্ধ করে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর মারধর করেন কয়েকজন শিক্ষক, বিএনপির এক নেতা ও বহিরাগতরা। এ ঘটনায় প্রতিবাদ করায় এক নারী শিক্ষককেও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা শিক্ষা অফিস ও দামুড়হুদা মডেল থানায় পৃথক লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) উপজেলা শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে শিক্ষকদের যথাসময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মাদ্রাসার হাজিরা রেজিস্টার নিজের দপ্তরে সংরক্ষণ করেন সুপারিনটেনডেন্ট আবু বকর সিদ্দিক। এ সময় সহকারী শিক্ষক ইকবাল হোসেন তার কাছ থেকে হাজিরা খাতা নেওয়ার চেষ্টা করেন। খাতা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সুপারিনটেনডেন্টকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনার কিছু অংশ মাদ্রাসার সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়। ফুটেজে সহকারী শিক্ষক ইকবাল হোসেনকে পেছন থেকে তাকে আঘাত করতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এর পরদিন মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে মাদ্রাসার কার্যক্রম চলাকালে আবারও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দামুড়হুদা উপজেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল হামিদ, সহকারী শিক্ষক ইকবাল হোসেন, ইউসুফ আলীসহ ৪-৫ জন শিক্ষক ও বহিরাগত সুপারিনটেনডেন্টের কক্ষে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে কক্ষের দরজা বন্ধ করে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরে সুপারিনটেনডেন্ট আবু বকর সিদ্দিককে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সময় তার চিৎকার শুনে সহকারী শিক্ষিকা সাবেকুন নাহার মিতা এগিয়ে এসে ঘটনার প্রতিবাদ করেন। এতে তার সঙ্গেও অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
সহকারী শিক্ষিকা সাবেকুন নাহার মিতার অভিযোগ, তার বাড়ি খুলনা জেলায় হওয়ায় তাকে রাস্তাঘাটে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি সুপারিনটেনডেন্টের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন, যা বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এ পরিস্থিতিতে মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ রেখেছি।
মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট আবু বকর সিদ্দিক বলেন, শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হাজিরা রেজিস্টার নিজের হেফাজতে রাখাকে কেন্দ্র করেই সহকারী শিক্ষক ইকবাল হোসেনসহ কয়েকজনের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরে বিএনপি নেতা, কয়েকজন শিক্ষক ও বহিরাগতরা তার কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাকে মারধর করেন। এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসন, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস ও থানায় পৃথক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার মিকাইল হোসেন বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তারা জানতে পেরেছেন। ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী রোববার থেকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দামুড়হুদা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাসেল বলেন, এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে মারধর এবং প্রতিবাদ করায় নারী শিক্ষককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
