সাপে কাটা রোগীকে হাসপাতালের বদলে ওঝার ঝাড়ফুঁক
সাপে কাটার পর হাসপাতালে না নিয়ে ওঝার মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করানোর ঘটনা আবারও সামনে এলো মৌলভীবাজারে। জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের ডোমাবাড়ী গ্রামের এক ব্যক্তিকে সাপে কাটার পর হাসপাতালে না নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ওঝা দিয়ে ঝাড়ফুঁক করানো হয়। সেই দৃশ্যের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই জেলাজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৪ নম্ববর বুধবার রাতে ডোমাবাড়ী গ্রামের ওই ব্যক্তিকে বিষধর সাপে কাটা রোগীকে ওঝা ঝাড়ফুঁক দিচ্ছে। ঘটনার পরপরই তাকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়ার কথা থাকলেও পরিবারের কয়েকজন সদস্য ও প্রতিবেশীরা প্রথমে ওঝার শরণাপন্ন হন। পরে রাড়িতে রেখেই ওঝাকে দিয়ে ঝাড়ফুঁক করানো হয় বলে ছবিতে দেখা যায়।
ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ লিখেছেন, এই ডিজিটাল যুগে এসেও মানুষ কেন এখনো কুসংস্কারে বিশ্বাস করছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, গ্রামাঞ্চলে সচেতনতার অভাব, হাসপাতালের প্রতি ভয় এবং ওঝাদের দাপটের কারণেই এমন ঘটনা বারবার ঘটছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (উপ-পরিচালক) ডা. প্রণয় কান্তি দাশ বলেন, সাপের বিষের চিকিৎসায় ঝাড়ফুঁকের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক এবং প্রাণঘাতী হতে পারে।
তিনি বলেন, সাপে কাটলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোগীকে হাসপাতালে আনতে হবে। হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম রয়েছে। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে অধিকাংশ রোগীই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু ঝাড়ফুঁকের পেছনে সময় নষ্ট করলে বিষ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তখন রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যায়।
ডা. প্রণয় কান্তি দাশ আরও বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, বিষহীন সাপে কাটলেও মানুষ আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওঝারা সেই আতঙ্ককে পুঁজি করে ঝাড়ফুঁক করে। রোগী এমনিতেই ভালো হয়ে গেলে ওঝারা তার কৃতিত্ব দাবি করে। আর বিষধর সাপে কাটা রোগী ঝাড়ফুঁকের কারণে মারা গেলে বলা হয়, অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর সাপের কামড়ে কয়েক হাজার মানুষ আক্রান্ত হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ মারা যান শুধু সময়মতো হাসপাতালে না আসার কারণে। মৌলভীবাজার জেলাও এর ব্যতিক্রম নয়। বর্ষা মৌসুমে এবং ধান কাটার সময় সাপের কামড়ের ঘটনা বেড়ে যায়। বিশেষ করে চা বাগান, হাওর ও গ্রামাঞ্চলে এই ঝুঁকি বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ডোমাবাড়ী গ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে এখনো ওঝাদের বেশ প্রভাব রয়েছে। সাপে কাটলেই অনেকে প্রথমে ওঝার কাছে ছুটে যান। কেউ কেউ গামছা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলেন, কেউ ব্লেড দিয়ে কেটে বিষ বের করার চেষ্টা করেন। চিকিৎসকরা বলছেন, এসব পদ্ধতিও অত্যন্ত বিপজ্জনক। শক্ত করে বাঁধলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে অঙ্গহানি হতে পারে। কাটাছেঁড়া করলে সংক্রমণ হয়ে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়।
এ বিষয়ে সচেতন মহলের দাবি, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা দিলেই হবে না, গ্রামে গ্রামে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মসজিদ, মন্দির, স্কুল, বাজারে মাইকিং করে মানুষকে বোঝাতে হবে, সাপে কাটলে প্রথম কাজই হলো হাসপাতালে নেওয়া। ওঝা, কবিরাজ, ঝাড়ফুঁক দিয়ে বিষ নামানো যায় না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাপে কাটলে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। রোগীকে শান্ত রাখতে হবে, নড়াচড়া কম করাতে হবে। কাটা স্থান সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। কোনোভাবেই মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করা যাবে না। যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নিতে হবে।
মৌলভীবাজারের এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, কুসংস্কারের শেকড় এখনো কতটা গভীরে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের যৌথ উদ্যোগে এই কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জোরালো প্রচার চালানো দরকার। তা না হলে ডোমা গ্রামের মতো ঘটনা বারবার ঘটবে। আর অকালে ঝরে যাবে মূল্যবান প্রাণ।
