কক্সবাজার
দৃষ্টিনন্দন স্টেশন, মিলছে না কাঙ্খিত সেবা
সংগৃহীত ছবি
দূর থেকে দেখলে মনে হবে বিশাল এক ঝিনুক। ছয়তলাবিশিষ্ট ব্যতিক্রমী নকশার ভবনটি পর্যটননগরী কক্সবাজারের আইকনিক রেলস্টেশন। আধুনিক স্থাপত্যশৈলী আর বিশাল অবকাঠামোর কারণে শুরু থেকেই স্টেশনটি মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। কিন্তু দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপনার আড়ালে রয়েছে যাত্রীসেবার অপূর্ণতা। উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতিশ্রুত সুযোগ-সুবিধার বড় অংশই চালু হয়নি। ফলে আধুনিক স্টেশন পেয়েও প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন যাত্রীরা।
প্রায় ২৯ একর জমির ওপর নির্মিত স্টেশনটির আয়তন ১ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুট। ছয়তলাবিশিষ্ট এই ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২১৫ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথের সঙ্গে স্টেশনটির উদ্বোধন করা হয়। একই বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচল। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো দেশের রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয় পর্যটননগরী কক্সবাজার। তবে রেল যোগাযোগ চালু হলেও স্টেশনটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
স্টেশনটিতে যাত্রীদের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছিল ১৮ ধরনের সেবা। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত চালু হয়েছে মাত্র দুটি বলে জানা গেছে। তারকা মানের হোটেল, রেস্তোরাঁ, শপিংমল, লাগেজ রাখার লকার, শিশুযত্ন কেন্দ্র, যাত্রী লাউঞ্জসহ বিভিন্ন সুবিধা চালু না হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ছেন পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীরা। বিশেষ করে দিনের বেলায় কক্সবাজার ঘুরে রাতের ট্রেনে ফিরে যেতে চাওয়া পর্যটকদের জন্য লাগেজ নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা না থাকাটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
![]()
স্টেশনটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিচতলায় টিকিট কাউন্টার, অভ্যর্থনা কক্ষ, তথ্যকেন্দ্র, মসজিদ, শিশুদের বিনোদনের জায়গা, যাত্রী লাউঞ্জ ও পদচারী-সেতুতে যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় অপেক্ষাকক্ষ, শপিংমল, রেস্তোরাঁ ও শিশুযত্ন কেন্দ্রের পরিকল্পনা করা হয়। তৃতীয় তলায় রাখা হয়েছে ৩৯ কক্ষের তারকা মানের হোটেলের অবকাঠামো। চতুর্থ তলায় রেস্তোরাঁ, সম্মেলনকক্ষ ও শিশুযত্ন কেন্দ্র এবং ওপরের তলাগুলোতে কার্যালয় ও বহুমুখী ব্যবহারের হল নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এসব অবকাঠামোর অনেকগুলোই এখনো যাত্রীদের ব্যবহার উপযোগী সেবা হিসেবে চালু হয়নি।
দৈনিক প্রায় ৪৬ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় স্টেশনটি নির্মাণ করা হলেও এত বড় স্থাপনায় প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা চালু না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে এর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে। বাস্তবে প্রতিদিন কতসংখ্যক যাত্রী ও দর্শনার্থী স্টেশনটি ব্যবহার করেন, তার নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে যাত্রীচাপের সঙ্গে সেবার সক্ষমতা তুলনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় স্টেশনের বিভিন্ন স্থাপনা ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের সরেজমিন প্রতিবেদনে ভবনের কিছু অংশে ধুলাবালু, মরিচা ও শ্যাওলা জমা এবং শৌচাগার ও বিভিন্ন ফিটিংসের ক্ষতির কথা উঠে এসেছে। চলন্ত সিঁড়িসহ কিছু যন্ত্রপাতিতেও সমস্যার কথা জানা গেছে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ বাড়বে।
স্টেশনটির পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা নিয়েও রয়েছে জটিলতা। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগে অনুমোদন না পাওয়া এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্টেশন পরিচালনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিলম্বকে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে পরিচালনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে পরিচালনার শর্ত শিথিল করে নতুন দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত সেবাগুলো চালুর অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে।
কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এখানে আসেন। তাঁদের জন্য আধুনিক রেলস্টেশন শুধু যাতায়াতের স্থান নয়, বরং পর্যটন অভিজ্ঞতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্টেশনে পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, পর্যাপ্ত বসার জায়গা, বিশুদ্ধ পানীয় জল, লাগেজ সংরক্ষণ, খাবার, তথ্যসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বয়স্ক, শিশু ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলাও প্রয়োজন।
![]()
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সেটি পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করার পরিকল্পনা শুরু থেকেই নিশ্চিত করা জরুরি। স্টেশনটির অব্যবহৃত জায়গা ও সুবিধাগুলো চালু করা গেলে যাত্রীরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি রেলওয়ের আয় বাড়ারও সুযোগ তৈরি হবে। তবে সেবাগুলো চালুর আগে পরিচালন ব্যয়, জনবল, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এখন প্রধান প্রত্যাশা, দ্রুত স্টেশনটির পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা নিশ্চিত করা এবং প্রতিশ্রুত সেবাগুলো পর্যায়ক্রমে চালু করা। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামত, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনকে পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু একটি স্টেশনের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার যাত্রীসেবার মানে। তাই ২১৫ কোটি টাকার এই স্থাপনা যেন কেবল ছবি তোলার আকর্ষণ হয়ে না থাকে, বরং আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব রেলসেবার বাস্তব উদাহরণ হয়ে ওঠে—এটাই এখন পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীদের প্রত্যাশা।
