কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুনে পরিবারের ৬ সদস্য নিখোঁজ, জানালা ভেঙে লাফিয়ে প্রাণে বাঁচেন আশিকুল
‘আর ১০ মিনিট পেলে আমার স্ত্রীও বাঁচত’
সংগৃহীত ছবি
আর ১০টা মিনিট সময় পেলে আমার স্ত্রীও নামতে পারত।’ কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ আগুন থেকে প্রাণে বেঁচে আসা আশিকুল ইসলামের কণ্ঠে তখন শুধুই হাহাকার। চোখের সামনে স্ত্রীকে হারানোর বেদনা আর পরিবারের অন্য সদস্যদের পরিণতি নিয়ে উৎকণ্ঠায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির স্বজনদের নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন আশিকুল। শনিবারই তাঁদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ফেরার আগেই আগুন কেড়ে নেয় তাঁদের আনন্দময় ভ্রমণের সবটুকু স্মৃতি। ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে আশিকুলের স্ত্রীসহ পরিবারের ছয় সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন।
শনিবার সকালে উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগার পর কীভাবে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান আশিকুল।
তিনি বলেন, ঘুমের মধ্যে আগুন দেখতে পেয়ে তাঁর স্ত্রীই তাঁকে ডেকে তোলেন। এরপর পাশের কক্ষে থাকা অন্য স্বজনদের ডাকতে যান তিনি। এর মধ্যেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রাণ বাঁচাতে আশিকুল একটি জানালা ভেঙে সেখান দিয়ে লাফ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী আর বেরিয়ে আসতে পারেননি।
স্ত্রীকে হারানোর আশঙ্কায় ভেঙে পড়া আশিকুল বারবার বলছিলেন, আর কয়েক মিনিট সময় পেলে হয়তো তাঁর স্ত্রীও প্রাণে বেঁচে ফিরতে পারতেন।
ঢাকায় ফেরার কথা ছিল শনিবার
আশিকুল জানান, পরিবারের ১০ সদস্যকে নিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে কক্সবাজারে পৌঁছান তাঁরা। এরপর উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। পরিকল্পনা ছিল, ছুটি কাটিয়ে শনিবার ঢাকায় ফিরে যাবেন।
তবে আগের দিন রাতে তাঁর এক শ্যালিকার স্বামী ইফতি চুয়াডাঙ্গায় চলে যান। ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে তাঁদের পরিবারের নয়জন ছিলেন।
আশিকুলের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ছয়জন হলেন তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা, শ্যালিকা লায়লা জাহান নাবিলা, মিলিতা মেহজাবিন আলভি, ফারিহা কবির এবং তাঁদের স্বজন পাঁচ বছর বয়সী শিশু ফায়িজান আহমদ ও নাফিস তেহামি জেরিফ।
পরিবারের সদস্যদের এমন পরিণতির আশঙ্কায় দিশেহারা আশিকুল হাসপাতালে বসে তাঁদের খোঁজ পাওয়ার অপেক্ষা করছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন আরও দুই স্বজন
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আশিকুলের পরিবারের আরও দুজন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তাঁরা হলেন তাঁর মামা-শ্বশুর মাসুদ ও মাসুদের স্ত্রী মিলা। পরে চিকিৎসকেরা তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন।
একদিকে নিজের চিকিৎসা ও স্বজনদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে স্ত্রীসহ পরিবারের ছয় সদস্যের কোনো খোঁজ না পাওয়া—সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটছে আশিকুলের।
ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হবে মরদেহ
শনিবার দুপুর ২টার দিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান সদর হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের দেখতে যান। এ সময় আশিকুল তাঁর নিখোঁজ স্বজনদের পরিচয় জেলা প্রশাসককে জানান।
জেলা প্রশাসক বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় সংগ্রহ করা হয়েছে। উদ্ধার করা মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা নেওয়া হচ্ছে। স্বজনদের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।
এর আগে শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
তবে উদ্ধার করা মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলমান থাকায় নিখোঁজ ছয়জনের মধ্যে কেউ তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একটি ছুটি, পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা—সবকিছুই মুহূর্তে বদলে দিয়েছে সেই আগুন। জানালা ভেঙে লাফিয়ে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন আশিকুল, কিন্তু স্ত্রীসহ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে অসহনীয় যন্ত্রণায়। তাঁর কণ্ঠে তাই বারবার ফিরে আসছে সেই আক্ষেপ—আর মাত্র ১০ মিনিট সময় পেলেই হয়তো স্ত্রীকেও বাঁচানো যেত।
