সেই চিকিৎসকের বাড়ি থেকে অস্ত্র-গুলি উদ্ধার, উত্তাল ক্যাম্পাস
সিরাজগঞ্জে মেডিকেল ছাত্রকে গুলি
সিরাজগঞ্জ শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেল কলেজে শিক্ষকের গুলিতে ছাত্র আহতের ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠেছে ক্যাম্পাস। আজ মঙ্গলবার অভিযুক্ত শিক্ষকের শাস্তির দাবিতে ক্যাম্পাসের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছেন, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বরখাস্ত, বদলি ও বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অধিদপ্তর তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।
পুলিশ বলছে, শিক্ষক রায়হান শরীফের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে দু’টি বিদেশী পিস্তল ও ৮১ রাউন্ড তাজা গুলিসহ বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। গুলির ঘটনায় শিক্ষার্থীর বাবা ও অবৈধ দুটি পিস্তল ও তাজা গুলিসহ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ডিবি পুলিশ বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে।
কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সিরাজগঞ্জ শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালে আইটেম পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষক রায়হান শরীফ তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে পিস্তল দিয়ে গুলি ছোড়ে। এতে কলেজের শিক্ষার্থী বগুড়া শহরের ধানসিঁড়ি নাটাইপাড়ার আব্দুল্লাহ আল আমিনের ছেলে আরাফাত আমিন তমাল উরুতে গুলি লেগে আহত হন। এ ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। মঙ্গলবার সকালে কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষক রায়হান শরীফ প্রায়ই নেশাগ্রস্ত ও পিস্তল এবং অস্ত্র নিয়ে ক্লাসে আসতো এবং টেবিলে অস্ত্র রেখে শিক্ষার্থীদের ভীতি সৃষ্টি করতেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময় ছাত্রীদের মোবাইলে ভিডিও কল দিয়ে বিরক্ত করতন। বিষয়টি কলেজ প্রশাসনকে মৌখিকভাবে জানানো হলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষক রায়হান শরীফ সিরাজগঞ্জ শহরের সরকারি কলেজের পাশে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। আর শিক্ষার্থীদের বাড়ি বিভিন্ন জেলায়। এ কারণে তার ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারতেন না। অস্ত্র হাতে ক্লাসে শিক্ষক- এমন ঘটনা কলঙ্কজনক বলে আখ্যায়িত করে শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত শিক্ষকের মেডিকেল সনদ বাতিল, চাকুরি থেকে স্থায়ী বরখাস্তসহ সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন। একইসঙ্গে শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিতসহ নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তারা।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আমিরুল ইসলাম চৌধুরী জানান, ওই শিক্ষক নিজের ইচ্ছামতো কলেজে আসতেন। অস্ত্র নিয়েও আসতেন। বিষয়টি মৌখিকভাবে জানার পর তাকে নোটিশ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোন নোটিশের জবাব দেননি। আর স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় সবাই তার ভয়ে তটস্থ ছিলেন। তিনি আরও জানান, জরুরি বৈঠকে শিক্ষক রায়হান শরীফকে সাময়িক বরখাস্ত, অন্যত্র বদলিসহ বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধৈর্য্য ধরার পাশাপাশি ক্লাসে মনোযোগ দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালককে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সকাল থেকেই তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ জানান, গতকাল বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানার পরই প্রথমে শিক্ষার্থীর সুচিকিৎসার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। মন্ত্রীর নির্দেশে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আহত শিক্ষার্থী, তার বাবা-মা ও কলেজের বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের সাথে কথা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের সাথে কথা বলা শেষে তদন্ত প্রতিবেদন এবং সুপারিশ করা হবে। সুপারিশ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এছাড়াও অবৈধ অস্ত্র ও মামলার বিষয়গুলো পুলিশ প্রশাসন তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. কামরুল হাসান মুরাদ জানান, বর্তমানে আহত শিক্ষার্থী তমাল শারীরিক অবস্থা ভাল ও শঙ্কামুক্ত।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম জানান, অভিযুক্ত শিক্ষকের কাছ থেকে লাইসেন্সবিহীন ২টি বিদেশী পিস্তল, ৮১ রাউন্ড তাজাগুলি, ৪টি ম্যাগজিন, দু’টি বিদেশী ছোরা, ১০টি বার্মিজ চাকু, দু’টি ব্র্যাশ নাকেল, একটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আহতের ঘটনায় শিক্ষার্থীর বাবা আব্দুল্লাহ আল আমিন বাদী হয়ে একটি মামলা এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার ঘটনায় ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক আব্দুল ওয়াদুদ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা দায়ের করেছে। দুটি মামলা ডিবি তদন্ত করছে। দুই মামলায় দুপুর ২টার দিকে ডিবি পুলিশ চিকিৎসক রায়হান শরীফকে ৭দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে সোপর্দ করেন। বিকালে ১৬৪ ধারায় চিকিৎসক রায়হান জবানবন্দী দিলে আদালত তা রেকর্ড করেন।
সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. জান্নাত আরা হেনরী দুপুরে কলেজ ক্যাম্পাসে আহত শিক্ষার্থীর খোঁজ-খবর নেন এবং শিক্ষার্থীদের অভিযুক্ত শিক্ষক রায়হান শরীফের শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করেন।
