খানজাহান আলীর মাজারে প্রতারণার শিকার পর্যটকরা
বিশ্ব ঐতিহ্যের শহর বাগেরহাটের খানজাহান আলী(র) এর মাজারে ঘুরতে এসে বিভিন্নভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন পর্যটকরা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত পর্যটকদের কাছ থেকে কুমির দেখিয়ে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা, হাতে তাবিজ বাঁধা এবং বিভিন্ন কৌশলে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কর্তব্যরত খাদেমদের বিরুদ্ধে। ঘুরতে এসে আনন্দ উপভোগের পরিবর্তে হয়রানির শিকার হয় বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন একাধিক পর্যটক।
বরিশালের পিরোজপুর থেকে খান জাহান মাজারে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে এসেছেন সাকিব হাসান। মাজারের দিঘিতে থাকা কুমির দেখার জন্য পাড়ের এক ফকিরের বাড়িতে যায় তারা। এসয় কৌশলে তাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয় সেই ফকির। এছাড়াও মাজারে ঢোকা থেকে শুরু করে জুতা রাখার জন্যও টাকা দাবি করেন ফকিরেরা।
এবিষয়ে সাকিব হাসান দ্য নিউজকে বলেন, ‘বন্ধুদের সাথে বাগেরহাটের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করেছি। দুপুরের পর খাওয়া-দাওয়া শেষ করে মাজারে এসেছি ঘুরতে। এখানে এসে পদে-পদে প্রতারিত হচ্ছি আমরা। জুতা খুলে মাজারের ভেতরে ঢোকার পর আমাদের জুতা আটকে রেখেছিল। পরে টাকা দিয়ে জুতা নিতে হয়েছে। এখানকার খাদেমদের আচরণ খুবই খারাপ। হাতে একটি তাবিজ বেঁধে দিয়ে টাকা দাবি করেছে। টাকা না দিলে তাদের খারাপ আচরণের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তারা কুমির দেখিয়েও আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা নিয়েছে।’
পরিবার নিয়ে মাজারে ঘুরতে এসেছেন মোঃ সেলিম আল দ্বীন নামের এক ব্যক্তি। তার অভিজ্ঞতাও তিক্ততায় ভরা। এর আগেও তিনি মাজারে এসে কয়েকবার প্রতারিত হয়েছেন। ফকিররা বিভিন্ন প্রতারণার ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিয়েছেন টাকা। যে কারণে পরিবার নিয়ে এবার ঘুরতে এসে খান জাহানের সমাধি বা মেইন মাজারে প্রবেশ করেননি তিনি।
এসময় বাগেরহাটের কচুয়া থেকে আসা মোহাম্মদ সেলিম আল দ্বীন দ্য নিউজকে বলেন, ‘মাজারের ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন রকম প্রতারণার শিকার হয়েছি। মাজারের খাদেমরা বিভিন্ন পাথরের উপর হাত রেখে মানত করিয়েছে এবং দানবাক্সে টাকা না দিলে অনেক বড় ক্ষতি হবে বলে ভয় দেখিয়ে টাকা নিয়েছে। টাকা দিতে না চাইলে খারাপ ব্যবহারের সম্মুখীন হয়েছি। তাই পরিবার নিয়ে মাজারের ভেতরে প্রবেশ না করে বাইরে থেকে ঘুরে বাড়ি ফিরেছি।’
আফরোজা পারভিন নামে আরেক পর্যটক বলেন, ‘বহুদিনের ইচ্ছা ছিল বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো ঘুরবো। ঈদ উপলক্ষ্যে পরিবারের তিন সদস্য নিয়ে খান জাহান মাজারে আসার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু এখানে এসে আনন্দ উপভোগের থেকে বেশি হয়রানির শিকার হলাম। মাজারে আমার কোনো মানত নেই, নিতান্তই ঘুরতে এসেছি। কিন্তু জোরপূর্বক দান বাক্সে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়েছি।‘
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী খান জাহান আলী(র) এর মাজারে বছরের প্রায় সবসময় পর্যটকরা বেড়াতে আসে। এসব পর্যটকদের কাছ থেকে মাজারের কতিপয় খাদেমরা বিভিন্ন সময় জোরপূর্বক টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়। ঈদের সময় পর্যটকদের চাপ বেশি তাই মাজারের কয়েকজন প্রভাবশালী খাদেম এ ধরনের কর্মকাণ্ড করে টাকা ইনকাম করছে।
তিনি আরও বলেন, ‘মাজারের সকল খাদেমদের একত্রিত করে কোনো কমিটি এখানে গঠন করা হয়নি। কয়েকজন প্রভাবশালী খাদেমরা বিতর্কিত কর্মকান্ডের মাধ্যমে মাজারের সুনাম ক্ষুন্ন করছে। পর্যটকরা যদি প্রতিনিয়ত এখানে এসে হয়রানির শিকার হয়, তাহলে একসময় বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত স্থানে কেউ আসতে চাইবে না। আমরা এর সমাধান চাই। ’
‘জোরপূর্বক টাকা আদায়সহ পর্যটক হয়রানির বিষয়টি অস্বীকার করে মাজারের প্রধান খাদেম শের আলী ফকির বলেন, ‘হযরত খান জাহান(র) মাজারে যারা আসে, তারা স্বেচ্ছায় কিছু দিলে আমরা গ্রহণ করি। কখনও কারো কাছ থেকে জোরপূর্বক কিছু আদায় করি না।’
টুরিস্ট পুলিশ বাগেরহাট জোনের পরিদর্শক মো. নুরুল ইসলাম দ্য নিউজকে বলেন, ‘আমিও শুনেছি, আগে পর্যটকদের হয়রানির ঘটনা ঘটতো। আমি আসার পর কেউ এ ধরনের অভিযোগ করেননি। আমরা সবসময় পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করে থাকি। যদি কেউ অভিযোগ করে তাহলে আইন অনুযায়ী সমাধান করা হবে।’
