লিবিয়ায় ২ শ্রমিককে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি বাংলাদেশে
লিবিয়ায় অপহরণের শিকার হয়েছেন লালমনিরহাটের ২ শ্রমিক। অপহরণকারীরা এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে। টাকা পাঠাতে বলেছে, বাংলাদেশে থাকা অপহরণকারী চক্রের বিকাশ নম্বরে। টাকা না দিলে ওই শ্রমিকদের হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেয়া হয়েছে তাদের পরিবারকে। অপহরণের শিকার ওই দুই শ্রমিক হলেন, লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের সিন্দুরিয়া গ্রামের জয়নাল আবেদীনের ছেলে আল আমিন (২৩) এবং জয়নাল আবেদীনের জামাতা হাফিজুল ইসলাম (৪০)। এ ঘটনায় পরিবারে চলছে আতঙ্ক আর কান্নাকাটি। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানিয়েছে উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. রুহুল আমিন।
শনিবার অপহরণের শিকার শ্রমিকদের একজনের পিতা ও অপরজনের শ্বশুর জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘অজ্ঞাতনামা ওই ব্যক্তি ২টি বিকাশ নম্বর দিয়েছেন। দু’টি নম্বরে ৫০ হাজার করে মোট ১ লাখ টাকা পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। খবর শুনে আমার স্ত্রী আলেয়া অসুস্থ হয়ে পড়েছে।’
অসুস্থ আলেয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে আর মেয়ের জামাই ঠিকমতো টাকা পয়সা কামাই করতে পারেনি। এখন এই একলাখ টাকা কোন্টে থেকি দিমো? টাকা না দিলে ওমরা তো ছাওয়া ও জামাইক মারি ফেলাইয়া লাশও গুম করি ফেলাইবে।’
জয়নাল আবেদীনের মেয়ে জয়নব বলেন, ‘আমার স্বামী ও একমাত্র ভাই আল আমিন একসঙ্গে লিবিয়ায় গেছেন। এখন সেখানে অপহরণের শিকার হওয়ায় আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন স্বামীকে খুঁজে বের করে দেশে আনতে বলছেন। তারা আমাকে বলেছেন, আমার স্বামী ফিরে না আসলে আমাকে শ্বশুরবাড়িতে ঢুকতে দিবে না। স্বামীকে ফেরত না পেলে বুঝি আমার সংসারটাই ভেঙে যাবে।’
লিবিয়ায় কাজ করতে যাওয়া আল আমিন নামের অপর আরেক শ্রমিকের ভাই লিটন মিয়া (২৩) বলেন, ‘আমাদের বাড়ি রাজারহাটের ভীম শর্মা গ্রামে। গত ১১ মার্চ সকাল আনুমানিক ৭টা ৫১ মিনিটে লিবিয়া থেকে আমার নম্বরে ফোন করে জানানো হয়, আমার ভাই আল আমিন, খালাতো ভাই রাকিবুল, সিন্দুরিয়া গ্রামের আরেক আল আমিন, তার ভগ্নিপতি হাফিজুলকে অপহরণ করা হয়েছে। তাদেরকে জীবিত পেতে চাইলে জনপ্রতি ৫ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দিতে হবে। আর যদি আইনের আশ্রয় নেয়া হয় তাহলে তাদের হত্যা করে লাশ গুম করা হবে বলেও আমাকে হুমকি দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার ধারণা এই অপহরণের পেছনে পঞ্চগ্রামের সিন্দুরিয়া গ্রামের আবদুল মোন্নাফের লিবিয়াপ্রবাসী ছেলে মিজানুর রহমান, একই ইউনিয়নের রামরাম গ্রামের সামসুল হকের ছেলে লিবিয়াপ্রবাসী মো. নাজমুল হুদা (২৩) এবং আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে লিবিয়াপ্রবাসী মো. সুলতান (৩২) কোনো না কোনোভাবে জড়িত রয়েছে। তাই ৬ এপ্রিল লালমনিরহাট সদর থানায় মামলা করেছি’।
অপহরণের শিকার আল আমিনের পরিবার জানান, গত তিন বছর আগে জমিজমা ও সহায় সম্বল সব বিক্রি করে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে আল আমিনকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। একই সাথে তার বোন জামাই হাফিজুল ইসলামও লিবিয়ায় যান। তিন বছরে কোনো সমস্যা না হলেও চলতি বছরের ১১ মার্চ সকাল ৮ টায় অজ্ঞাত পরিচয়ে এক ব্যক্তি আল আমিনের বাবা জয়নাল আবেদীনের ইমো নম্বরে ফোন করে জানায়, আল আমিন ও হাফিজুলকে অপহরণ করা হয়েছে। এরপর এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। মুক্তিপণ না দিলে তাদের মেরে ফেলা হবে বলে হুমকিও দেয় তারা।
তারা আরও জানান, আল আমিন ও হাফিজুল একই গ্রামের গ্রামের আবদুল মোন্নাফের ছেলে লিবিয়া প্রবাসী মিজানুর রহমানের মাধ্যমে লিবিয়ায় গেছেন। অপহরণের সঙ্গে মিজানুর জড়িত থাকতে পারেন এবং তার লোকেরা মুক্তিপণের জন্য লিবিয়ায় অপহরণ করে আল আমিন ও হাফিজুলকে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখতে পারে। তাই সদর থানায় ৬ই এপ্রিল একটি লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে।
লালমনিরহাট সদর থানার উপপরিদর্শক ও পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের বিট অফিসার (এসআই) মো. রুহুল আমিন এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘লিবিয়ায় মুক্তিপণের জন্য শ্রমিকদের অপহরণের বিষয়ে পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি সম্পর্কে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহোদয় অবহিত আছেন। ওসি স্যারের নির্দেশনার আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
