‘শোলার ফুল’-এ স্বাবলম্বী ঝিনাইদহের নারীরা
গৃহবধূ সাবিনা ইয়াসমিন ও তুলি বেগম ঘর-গৃহস্থালী সেরে বাড়তি সময়ে বসে পড়েন শোলার তৈরি শাপলা, লিলি, চন্দ্রমল্লিকা, বেলি, গোলাপসহ নানা প্রকারের ফুল তৈরিতে। প্রতিদিন তারা এই ফুল তৈরির কাজ করে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয়ও করেন।
শুধু সাবিনা বা তুলিই নয়, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নরদহী গ্রামের মাঝের পাড়ায় এরকম প্রায় ৩০ জন নারী শোলার ফুল তৈরি করে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছেন।
এই গ্রামে শোলা থেকে ফুল তৈরির কাজটির শুরু হয় ২০০৩ সালে। নদী-নাল ও খাল-বিলে জন্ম নেওয়া শোলা গাছ এই ফুল তৈরির প্রধান উপকরণ। শুকনো শোলা পরিমাপ মত কেটে রোল তৈরি করে ফুলের মাপ অনুযায়ী তা কেটে নেয় কারিগররা। এরপর হাতের নিপুণতায় সুতা দিয়ে বেঁধে বিভিন্ন প্রকার দৃষ্টি নন্দন ফুল তৈরি করেন তারা। তাদের দক্ষ কর্মের মাধ্যেমে প্রতিনিয়তই অতি পরিচিত বেলি, জিনিয়া, গোলাপ, চামেলি, পদ্ম, রজনী কলি, শাপলাসহ প্রায় ৪০ প্রকার ফুল তৈরি হচ্ছে। এই ফুলগুলো ঘর সাজানো বা যেকোনো ডেকোরেশনে ব্যবহৃত হয়।

মহিলাদের তৈরিকৃত শোলার ফুল "রিগ্যাল হ্যান্ডিক্রাফট এন্ড ড্রাই ফ্লাওয়ার" নামে করা হচ্ছে বাজারজাত। শোলার তৈরি সর্বাধিক চাহিদাসম্পন্ন বেলি, গোলাপ, চামেলি, লিলি, চন্দ্রমল্লিকা ও শাপলা ফুল যথাক্রমে হাজার প্রতি ১২০০, ১৩০০, ১৮০০,১ ৬০০, ২০০০ ও ২৫০০ টাকায় শুধুমাত্র ঢাকা শহরের নিউমার্কেট কলাবাগান ও মিরপুরে বিক্রি হয়। বর্তমানে কাঁচামালের অভাব ও পর্যাপ্ত পুঁজি বিনিয়োগ করতে না পারা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব, প্রস্তুতকৃত মাল সংরক্ষণের অভাবসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় শোলার ফুল প্রস্তুতকারী নারীদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেনি আজও।
কথা হয় ফুল তৈরির কাজ করা গৃহবধু ইয়াসমিনের সাথে। তিনি বলেন, “সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে আওতায় যদি আমাদের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো তাহলে আমাদের গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী অনেক গ্রামের নারীরা শোলার ফুল তৈরির মধ্য দিয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে পারতো। বর্তমানে আগের মত আমাদের প্রতিদিন কাজ হয় না, ফলে আয়ও কমে গেছে। তাই আমরা শোলার ফুল শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি”।
শোলার ফুল তৈরি ও বিপণনের সার্বিক দায়িত্ব পালনকারী তোফায়েল আহমেদ জানান, বর্তমানে স্থানীয়ভাবে ফুল তৈরির মূল উপকরণ শোলা পাওয়া না যাওয়ায় খুলনা, ফরিদপুর ও মাগুরা থেকে বেশি দামের শোলা কিনে আনতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অর্থ যোগান দিতে আমি হিমশিম খাচ্ছি। ব্যাংক থেকে ঋণ সহায়তাও পাচ্ছি না। চাহিদা থাকার পরেও বর্তমানে এ ব্যবসা বেশ মন্দা যাচ্ছে। মাসে ৬০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করে খরচ বাদে মাত্র ১৫ হাজার টাকা লাভ থাকছে। সরকারি সহায়তা পেলে শোলার শিল্পকে অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হবে বলে আমি মনে করি।
রাখালগাছি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিদুল ইসলাম মন্টু বলেন, “প্রায় দুই যুগ ধরে আমার ইউনিয়নের নরদহী গ্রামের নারীরা শোলার ফুল তৈরির কাজের সাথে যুক্ত। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নিকট তাদের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরায় তিনি মাঝারি আকৃতির একটি দোচালা ঘর নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন। যেখানে তারা একসাথে বসে সহজেই ফুল তৈরির কাজ করতে পারবেন। শোলার তৈরি ফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে এই ফুল তৈরি করে তা বিপণন করতে পারলে আমার ইউনিয়নের নারীরা একদিকে যেমন উপকৃত হবেন, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে বলে আমি মনে করি। তাই আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী বিনিয়োগকারী বন্ধুদের শোলার তৈরি ফুল তৈরি শিল্পের দিকে সুদৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানাই আমি”।
