মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন চাটমোহর শাহী মসজিদ
বাংলার মুসলিম স্থাপত্যে নতুন একটি অধ্যায় সংযোজন হয়েছিল ‘চাটমোহর শাহী মসজিদ’। ৪৪৩ বছর আগে প্রতিষ্ঠার সময় থেকে তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। শুধু তাই নয়, চাটমোহর পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে চোখের ভেতরে ঢুকে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে উপজেলা পরিষদের সামনে চার সড়কের মোহনায়, সুলতানি মোঘল আমলের নিদর্শন হয়ে।
ইতহাস থেকে জানা যায়, চাটাইয়ের (বাঁশের) ওপর মোহর ঢেলে ভুষালি মালের মতো বিক্রি করা হতো বলে স্থানের নামটি হয়ে গিয়েছিল ‘চাটমোহর’। শুধু তাই নয়, সেকালে মোঘল-পাঠান-পর্তুগীজ-আফ্রিদিরাও সেই মোহরের টানে এখানে এসে ঘাঁটি গেড়েছিলেন। এসেছিলেন ইরান থেকে ইসলাম প্রচারে পীর আউলিয়াগণও। ফলে পাবনা জেলার ইতিহাস বাতায়নে সবদিক থেকেই চাটমোহর নামটি সমুজ্জ্বল স্থান দখল করে আছে।
ইতিহাস আরো সাক্ষ্য দেয়, পাবনার অন্যতম প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র চাটমোহর এক সময় মোঘল-পাঠানদের অবাধ বিচরণ ভূমি। আর সে সময়ে ১৫৮১ খ্রিষ্টাব্দে মাসুম খাঁ কাবলি নামের সম্রাট আকবর এর পাঁচহাজারী এক সেনাপতি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। যা এখন চাটমোহর শাহী মসজিদ নামে পরিচিত।

বইপত্রে যা এখনো মাসুম খাঁ কাবলির মসজিদ বলেই উল্লেখ আছে। মসজিদটির ভেতরে দৈর্ঘ্য ৩৪ হাত, প্রস্থ ১৫ হাত, উচ্চতা প্রায় ৩০ হাত। ক্ষুদ্র, পাতলা নকশা খচিত লাল জাফরি ইটে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। মসজিদের দেয়ালটি সাড়ে চার হাত প্রশস্ত। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির সামনে ইদারার গায়ে কলেমা তৈয়বা লিখিত একখণ্ড কালো পাথর এখনো প্রথিত রয়েছে।
তিন গম্বুজবিশিষ্ট শাহী মসজিদটিতে তিনটি দরজা রয়েছে। মূল প্রবেশ পথটি ছাড়া, অন্য প্রবেশপথ দু’টি একই ধরনের। মসজিদটিতে তিনটি প্রবেশপথের সঙ্গে মিল রেখে পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে মোট তিনটি মিহরাব।
কেন্দ্রীয় মিহরাব থেকে দুই পাশের মিহরাবে রয়েছে বড় সুড়ঙ্গের মতো অপূর্ব নিদর্শন। ভূমি-নকশালঙ্কারে স্থাপত্য। অনুমান করা যায়, সুলতানী-মুঘল স্থাপত্যের রীতিতে মসজিদটি নির্মিত। মিম্বারের পাশে কষ্টি পাথরের মত কালো রঙের পাথরটি সৌন্দর্যের আরেকটি অংশ।
মসজিদটিতে এক খণ্ড কৃষ্ণ প্রস্তরের এক পাশে পারসী ভাষায় নির্মাণের ইতিহাস এবং অপর পাশে ব্রহ্ম, বিষ্ণু ও শিবের মূর্তি অঙ্কিত ছিল। যা বর্তমানে রাজশাহী বরেন্দ্র মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
মসজিদটি প্রায় ধ্বংস হওয়ার প্রাক্কালে ১৯০৪ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর অধিগ্রহণ করে নেয়। মূল কাঠামো অবিকল রেখে অধিদপ্তর থেকে কয়েক দফা সংস্কার করা হয়েছে। এখন মসজিদটি তার অতীত সৌন্দর্য অনেকটাই ফিরে পেয়েছে।

ইতিহাস জানায়, মাসুম খাঁ কাবলি সম্রাট আকবরের পাঁচ হাজার সৈন্যের অধিনায়ক ছিলেন। তার পূর্ব পুরুষ সুলতান হুসাইন শাহ্’র আমলে কাবুল থেকে এদেশে এসে চাটমোহর অঞ্চলে একটি জায়গির লাভ করেন এবং এখানেই বসবাস শুরু করেন। এখানেই মাসুম খাঁ’র জন্ম হয়। তার পূর্বপুরুষরা কাবুলের খোরাশানের তুরাবতী বংশের কাকশাল গোত্রের সৈয়দ ছিলেন। তার চাচা মীর্জা আজিজ কাকশাল সম্রাটের উজির ছিলেন। মাসুম খাঁ মাত্র কুড়ি বছর বয়সে সম্রাট আকবরের সৈন্যদলে যোগ দেন। সাহসিকতায় তিনি সহসাই পাঁচহাজারী মসনদদার পদে উন্নীত হন।
কিন্তু সেই মাসুম খাঁ কাবলি বাংলার বারভূঁইয়াদের বিদ্রোহকালে তাদের দলে যোগ দেন এবং আকবরের সেনাপতি ও গভর্নর শাহবাজ খানের সাথে যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে শীতলক্ষা তীরের (গাজিপুর) গহিন অরণ্যে আত্মগোপন করেন। সেখানেই ৪৪ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন।
বর্তমানে মসজিদটির পরিচালনা পরিষদের সভাপতি রয়েছেন পদাধিকার নিয়মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেদুয়ানিল হালিম। আর পেশ ইমাম হিসাবে হাফেজ কাজী আব্দুস সালাম মাসুদ এবং মুয়াজ্জিন হিসেবে রয়েছেন তরিকুল ইসলাম। আর পুরাকৃর্তি ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পক্ষে সাইট পরিচালক হিসেবে আছেন শাহজাহান আলী। তিনি তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই শাহী মসজিদের দেখাশুনা করছেন।
শাহজাহান আলী বলেন, নথিপত্রে চাটমোহর শাহী মসজিদ মাসুম খাঁনের নামে পাওয়া গেলেও সুলতানী-মোঘল আমলের শাহী মসজিদ মনে করে সারাবছরে বহু মানুষ আসেন পাবনার চাটমোহরে। দেশ-বিদেশ থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা আসেন একসারিতে তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ ও এর কারুকাজ দেখতে। সংস্কারের মাধ্যমে মূল কাঠামো ও সৌন্দর্য ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
মসজিদের ইমাম হাফেজ কাজী আব্দুস সালাম মাসুদ বলেন, দূর থেকে মসজিদটি বিশাল মনে হলেও, ভেতরে মাত্র দুই কাতার লোক নামাজে দাঁড়াতে পারেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমার নামাজ আদায় হয় এই মসজিদে। এছাড়া, মসজিদের বাইরে দু’টি ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় প্রতিদিন অনেকেই আসেন দেখতে, ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। ইতিহাস ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এমন একটি মসজিদের ইমাম হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।
ঢাকা থেকে কেউ মসজিদটি দেখতে আসতে চাইলে ঢাকা-ঈশ্বরদী রেলরুটের চাটমোহর স্টেশনে নেমে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে অটোরিকশা বা ভ্যানে চড়ে সহজে যেতে পারবেন। ঢাকার কমলাপুর থেকে সকালে আন্তঃনগর ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেসে চড়ে চাটমোহরে পৌঁছাবেন দুপুরে, সময় লাগবে মাত্র সাড়ে ৪ ঘণ্টা। চাটমোহরে ভালো মানের খাবার হোটেল রয়েছে। দুপুর থেকে ঘুরে বিকেলে পদ্মা এক্সপ্রেসে চড়ে আবার ঢাকা ফিরে যেতে পারবেন। এছাড়া, রাত্রিযাপন করতে চাইলেও চাটমোহর-পাবনা- ঈশ্বরদীতে রয়েছে আধুনিক সব হোটেল-মোটেল।
