১১০৩ বছরের ‘গোরকই’ কূপে যে কারণে পূণ্যার্থীদের ঢল
গোরক্ষনাথ মন্দিরের কূপের পানিতে স্লান করে নিজেকে পাপ মুক্ত করতে প্রতিবছরেই নর-নারীরা ভিড় জমান। ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ ইউনিয়নে অবস্থিত অন্যতম পুরাকীর্তি গোরক্ষনাথ মন্দির।
১১০৩ বছরের পুরোনো এই মন্দিরের কূপের পানি হিন্দু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে মহাপবিত্র। এছাড়াও প্রতি বছরের ফাল্গুন মাসে শিব চতুর্দশী তিথীতে পূণ্য স্নানের জন্য এই মন্দিরে আগমন ঘটে অসংখ্য পূণ্যার্থীর। কারণ অনেকের ধারণা, এই কূপের পানি দিয়ে গোসল করলে মনের আশা পূরণ হয়।
সরজমিনে গোরক্ষনাথ মন্দির ঘুরে দেখা যায়, মেলা উপলক্ষে প্রায় শতাধিক বিভিন্ন ধরণের মালা, শাখা-সিদুর, খেলনা ও মুখরোচক খাবারের দোকান বসেছে। এছাড়াও শিশু-কিশোরদের জন্য রয়েছে নাগর দোলনা। মেলায় দোকান দিয়ে অনেকের বাড়তি আয়ের সুযোগও হয়েছে।
জানা গেছে, গুপ্ত যুগ থেকে সেন যুগের মধ্যে অর্থাৎ ৯২০ সালের দিকে এই কূপ ও মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিলো। নাথ সহজিয়ার মতে গুরু গোরাক্ষ নাথের নামানুসারে কুপের এবং স্থানের নামকরণ করা হয়েছে গোরকই। আর এই ‘গরকই’ফরিকি স্নান বা বারুনীর মেলা হিসেবে আজও সমানভাবে সমাদৃত। প্রতি বছরে এই কূপে স্নান করতে ও শিব চতুর্দশী তিথীতে পূঁজা উপলক্ষে মেলায় বিভিন্ন জেলার নানাবয়সী লাখ লাখ নারী-পুরুষের সমাগম হয়।

নেকমরদ থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ‘গোরকই’ নামক স্থানে গোরক্ষনাথ মন্দির। এখানে গোরক্ষনাথ মন্দির ছাড়াও আছে নাথ আশ্রম। মন্দির চত্বরে আছে আরও ৫টি মন্দির। এছাড়াও আছে ৩টি শিব মন্দির ও ১টি কালি মন্দির। মন্দিরের পেছনে রয়েছে কূপটি। লাখ লাখ সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষেরা পাপ-মোচনের জন্য এই কূপের পানিতে স্নান করার উদ্দেশ্যে এখানে আসেন। কূপের পানি দিয়ে লাখ লাখ মানুষ স্নান করলেও কূপের এক ইঞ্চি পানি কমে না।
আরও জানা গেছে, গোরক্ষনাথ ছিলেন নাথ পন্থীদের ধর্মীয় নেতা খীননাথের শিষ্য। নবম-দশম শতাব্দির মধ্য ভাগে গোরক্ষনাথের আবির্ভাব ঘটে। তিনি ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে এখানে মন্দির স্থাপন করেন। অলৌকিক ওই কূপটি সেই সময়ে নির্মিত বলে প্রবীণদের ধারনা।
স্থানীয় পলাশ বর্মণ বলেন, প্রতিবছরেই এখানে মেলা বসে। মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসেন। যারা এখানে আসেন তারা মূলত মনবাসনা নিয়ে আসেন। যেমন কারও সন্তান না হলেও এখানে এসে প্রথমে এই কূপে স্নান করে শিব মন্দিরে পূঁজা করলে অনেকের সেই মনবাসনা পূরণ হয়। গঙ্গার জল আমাদের ধর্মে যেমন পবিত্র তেমনি এই কূপের পানিও আমাদের কাছে পবিত্র। তাই এই পানি দিয়ে আমরা গোসল করি। কেউ আবার শুদ্ধিকরণের জন্য শরীরে পানি ছিটিয়ে দেয়।
রংপুর থেকে আসা কুশলা নামে এক বৃদ্ধা বলেন, এখানে এসে কূপটিতে স্নান করে মন্দিরে পূঁজা করেছি, যাতে আমার মনোবাসনা পূরণ হয়। লালমনিরহাট থেকে আগত শ্যামলী রাণী নামে এক গৃহবধু বলেন, মানুষের মুখে শুনে এখানে এসেছি। এসে অনেক কিছু দেখলাম ও মেলা থেকে অনেক কিছু কিনেছি। এখানে অনেক মানুষের সমাগম হয়েছে।
মেলা আয়োজক কমিটি ও মন্দিরের সভাপতি কাশীনাথ বর্মন বলেন, শুনেছি ৯২০ সালে সিন্ধু দেশ থেকে এই গোরক্ষনাথ ও তার বন্ধু নাসির উদ্দিন নামে দুইজন এখানে আসেন। গোরক্ষনাথ এখানে বসবাস শুরু করেন ও নেকমরদে নাসির উদ্দিন। তখনই এখানে অলৌকিকভাবে মন্দির ও কূপটি নির্মিত হয়। তবে কিছু মন্দির আমরা সংষ্কার করে নির্মাণ করেছি।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামের সীতাকন্ডু মেলার সঙ্গে মিল রেখে আমরাও এখানে গোরক্ষনাথ শিব রাত্রীব্রত মেলা করে আসছি। শিবরাত্রীব্রত করলে ও কূপে স্নান করলে আমাদের মনকামনা এবং আশা পূরণ হয় তাছাড়া পাপও মোচন হয়।
