ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪ 

জোবায়ের- দ্য রিয়েল হিরো

রোকনুজ্জামান পিয়াস

প্রকাশিত: ২২:৫২, ২ এপ্রিল ২০২৪

শেয়ার

জোবায়ের- দ্য রিয়েল হিরো

জীবনের প্রতি বিতশ্রদ্ধ এক নারী শিশু সন্তান নিয়ে দৌঁড়াচ্ছেন রেললাইন ধরে। উল্টো দিক থেকে আসছে একটি ট্রেন। মুখোমুখি ট্রেন আর সন্তান কোলে নারী। উদ্দেশ্য পৃথিবীকে বিদায় জানানো। আর এই দৃশ্য যখন আশপাশের লোকজন দেখলেন, তখন আর উপায় নেই। তাকে নিবৃত্ত করতে গেলে তারাও যাত্রী হতে পারেন পরপারের। কিন্তু আর সবার মতো চিন্তা করেননি ১৮ বছরের কলেজ পড়ুয়া জোবায়ের রহমান নাফিউল। মৃত্যুঝুঁকি জেনেও তিনি ছুঁটে গেছেন। কোলের অবুঝ শিশুটিকে বাঁচাতে পারলেও বাঁচাতে পারেননি মা-কে। বাঁচতে পারেননি নিজেও।

 

না, এটি কোনো সিনেমার স্ক্রিপ্ট নয়, নয় কোনো শ্যুটিং দৃশ্য। বলছিলাম, রিয়েল হিরো জোবায়েরের কথা। যার জন্য কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতায় অনেক আগেই লিখে গেছেন-

 

‘এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য

বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে,

প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূণ্য

সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।’

 

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ বলছে, ওইদিন বেলা ১১টার দিকে শহরের কলেজ পাড়ার গৃহবধূ রাজিয়া বেগম তার দেড় বছরের শিশু আবিতকে নিয়ে পার্বতীপুরগামী পদ্মরাগ ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেন। তাদের-ই বাঁচাতে গিয়ে গৃহবধূর সঙ্গে ট্রেনের নিচে কাটা পড়েন জোবায়ের। তবে শিশুটিকে পৃথিবীর আলোতেই ছেড়ে গেছেন তিনি। তার আগে মেস থেকে প্রাইভেট পড়ার জন্য বের হয়েছিলেন কলেজছাত্র জোবায়ের।

 

তবে জোবায়ের পৃথিবীর ভ্রমণ শেষ করলেও মানুষ তার এই বীরত্ব মনে রাখবে আরও বহুদিন।  তার এমন মৃত্যুতে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমেছে এসেছে।

 

দ্য নিউজ-এর গাইবান্ধা সংবাদদাতা জানিয়েছেন, জোবায়ের রহমান নাফিউল-এর বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ভরতখালী গ্রামে। তার মৃত্যুর পর বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠেছে চারপাশ। ছেলের শোকে গৃহিণী মা জেবা আক্তার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরলেই সকলের কাছে মিনতি করে বলছেন, ‘আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও, আমি আর তোমাদের কাছে কিছুই চাই না।’ সাধারণ ব্যবসায়ী বাবা জাহিদুর রহমান  অনেক সমস্যার মধ্যেও ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমনটা হবে কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি তিনি। হতভাগা এই দম্পতির দুই ছেলে-মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে।

 

এসএসসিতে গোল্ডের জিপিএ-৫ পাওয়া নাজিউল ইসলাম জোবায়ের গাইবান্ধা শহরের এসকেএস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম বর্ষে অধ্যায়রনরত ছিলেন।  

 

এদিকে, রেললাইনের পূর্ব পাশের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সিজার নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী মর্মান্তিক ঘটনাটির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘তিনি দেখেন আদর্শ কলেজ সংলগ্ন মাঝি পাড়া এলাকায় একটি ট্রেন টানা হুইসেল দিচ্ছে আর এক মহিলা কোলে শিশু সন্তানটিকে নিয়ে ট্রেনের নিচে লাফ দেওয়ার জন্য ট্রেনের দিকে দৌড়াচ্ছে। এ সময় একটি ছেলে কাঁধে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে রেল লাইন পার হচ্ছিল। ছেলেটি দৌঁড়ে তাদের কাছে যান। এরই মধ্যে ট্রেনটি সেখানে পৌঁছে গেলে ছেলেটি কোলের সন্তানসহ মহিলাকে সরানোর জন্য টানাটানি শুরু করেন। তারপরই তাদের দু’জনকে ট্রেনটি ধাক্কা দেয়। এ সময় মহিলাটির কোলে থাকা শিশুটি ছিটকে রেল লাইনের পাশে পড়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এরপর স্থানীয়রা তিনজনকেই গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জোবায়েরকে মৃত ঘোষণা করে। উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজিয়াকে রংপুরে পাঠালে সেখানে তার মৃত্যু হয়। আর শিশুটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পরিবারের কাছে দেয়া হয়।’ 

 

এদিকে, জোবায়েরের মৃত্যুতে  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কবি ও সাংবাদিক রজতকান্তি বর্মণ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখছেন, ‘জোবায়েরের জন্য আমরা গর্বিত। ওর বাবা-মাকে কোনোভাবেই সান্ত্বনা দেওয়া যাবে না। প্রিয় সন্তান জোবায়েরকে হারানোর অভাব কেউ কোনোদিনই ওর বাবা-মাকে পূরণ করে দিতে পারবে না। কিন্তু জোবায়েরকে নিয়ে আমরা গর্ব করতেই পারি। সেটি হলো, আমাদের কিশোর, তরুণ সমাজ এখনো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়নি, পঁচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়ায়নি। আমরা আশান্বিত হতেই পারি, সমাজে এখনো জোবায়েরের মতো কিশোররা আছে, যারা নিজের সমূহ সর্বনাশ হতে পারে জেনেও মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। 

 

এসকেএস ফাউন্ডেশন-এর জনসংযোগ কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম বলেন , ‘জুবায়ের সুদীর্ঘ সময় থেকে মানবিক কার্যক্রম হিসেবে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকে কাজ করতো। সে অত্যন্ত মেধাবী হওয়ার কারণে এসকেএস স্কুল এন্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে দ্বাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে বিনা খরচে পড়াশোনা করাতো। তার এই মৃত্যুতে পুরো প্রতিষ্ঠান গভীরভাবে শোকাহত।’

 

 

 

live pharmacy
umchltd