ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪ 

প্রতিবন্ধী আয়াকে ডাক্তারের কুপ্রস্তাব, অভিযোগেও প্রতিকার মিলছে না

আরিফ সাওন

প্রকাশিত: ১৮:০০, ৩১ মার্চ ২০২৪

আপডেট: ২০:৩২, ৩১ মার্চ ২০২৪

শেয়ার

প্রতিবন্ধী আয়াকে ডাক্তারের কুপ্রস্তাব, অভিযোগেও প্রতিকার মিলছে না

ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। হাঁটতে হয় একপাশে কাত হয়ে। তাও খুব আস্তে আস্তে। চোখেও কম দেখেন। নাম্বার দেখতে একেবারেই চোখের কাছে নিতে হয় মোবাইল। এমন শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও দামিয়ে রাখতে পারেনি তাকে। পেশায় আয়া ওই নারী ২০১৫ সালে ইডেন মহিলা কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন। চাকরির বয়স যখন প্রায় শেষ, তখনই প্রতিবন্ধী কোটায় চাকরি পান আয়া হিসেবে। সবই ঠিকঠাক চলছিলো। এরইমধ্যে হাসপাতাতলের এক ডাক্তারের অনৈতিক কার্মকাণ্ড দেখে ফেলেন প্রতিবন্ধী আয়া। এবার ডাক্তারের নজর পড়ে আয়ার ওপর। তাকেও কুপ্রস্তাব দেন। মুখ বন্ধ রাখতে বন্ধ রাখেন তিন মাসের বেতন। এ বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরের অভিযোগ দিলেও প্রতিকার মেলেনি। বর্তমান হুমকি-ধামকির ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

অভিযুক্ত ডাক্তার হাজারীবাগের শহীদ শামসুন্নেছা আরজু মনি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার আশরাফ সিদ্দিকী। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি প্রতিবন্ধী বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মরত ওই আয়া। শুধু তিনিই নন, ডাক্তার আফরাফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে  অভিযোগ আরও অনেকের। কিন্তু কেউ ভয়ে মুখ খোলেন না। অ্যানেস্থেশিয়ার ডাক্তার হওয়ায় ভুক্তভোগীরা মনে করেন, প্রকাশ্যে তার বিপক্ষে গেলে তিনি যেকোনো সময় অজ্ঞান করে দুর্ঘটনা ঘাটতে পারেন।

ভূক্তভোগী নারীর দাবি, আশরাফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিবার পরিকল্পনা মডেল ক্লিনিকে বদলি করা হয়। কিন্তু বাসা হাজারীবাগের ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশে হওয়ায় আশরাফ সিদ্দিকীর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না তিনি। প্রতিনিয়ত থাকেন আতঙ্কে।

জানা যায়, ২০১৮ সালে আয়া পদে চাকরি পান ইডেনের ওই সাবেক ছাত্রী। হাজারীবাগের শহীদ শামসুন্নেছা আরজু মনি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের বদলি হন ২০২১ সালের ২৫ এপ্রিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবর ঢাকা মেডিকেলের পরিবার পরিকল্পনা মডেল ক্লিনিকে বদলি করা হয়।

প্রতিবন্ধী ওই আয়া বলেন, আমার বাসা হাজারীবাগে। শহীদ শামসুন্নেছা আরজু মনি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের পাশেই থাকি। ঢামেকে আমাকে বদলি করানো হয়েছে যাতে আমার যাতায়াতে কষ্ট হয়। আমি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে গেলেও ওই হাসপাতালের কাছে যেতে হয়। তাই আমি সব সময় ভয়ে থাকি।

অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি একদিন আশরাফ সিদ্দিকী স্যার এবং একজন ম্যাডামকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলি। এটাই আমার কাল হয়েছে। এরপর ওই ম্যাডাম তাকে বলেন, ‘স্যার তোমাকে ভালোবাসে। আমি বললাম, আমাকে তো সবাই ভালোবাসে। তিনি বললেন, না স্যার তোমাকে অন্য চোখে দেখে। যখন বিষয়টি জানাজানি হয়েছে, তখন ম্যাডামের সাথে ঝগড়া হয়। এরপর আমাকে রাতে ডিউটি করতে বলে। আমি স্যারকে বলি, স্যার আমি তো রাতে চোখে দেখি না। তখন আমাকে বলে রাতে চাকরি না করতে পারলে চাকরি ছেড়ে দেন।’

ভুক্তভোগী ওই নারী আরও বলেন, ‘আমি অনেক বার স্যারের কাছে মাফ চেয়েছি। বলেছি, স্যার আামকে মাফ করে দেন। কিন্তু মাফ করে না। মাফ না করে যখন একা থাকি, তখন আমার সামনে এসে খারাপ অঙ্গভঙ্গি করতে থাকেন।’

এসব বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের ডিজি ম্যাডাম থেকে শুরু করে সবাই স্যারের সর্ম্পকে জানেন। কিন্তু প্রতিকার পাইনি। এর পেছনে একটাই কারণ। তিনি ডিডি আমানুল্লাহ স্যারের প্রতিবন্ধী দুই মেয়েকে থেরাপি দেন, তাদের পড়ানও। সেজন্য আমানুল্লাহ স্যার তার প্রতি দুর্বল। তিনিই তাকে এখানে রাখেন।’
 
এ প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য ঢাকা জেলা পরিবার পরিবল্পনা উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আমান উল্লাহ্’র সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও বলা সম্ভব হয়নি। একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেনি।

হাজারীবাগের ওই কেন্দ্রে কর্মরত আরেক নারী বলেন, ‘কয়েকদিন আগেও আমার গায়েও হাত দিতে আসে। বেলা ২টার পর হাসপাতালে রোগী থাকে না। তখন আশরাফ সিদ্দিকী হঠাৎ হঠাৎ রুমে চলে আসেন। তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে অভিযোগ করি। তদন্ত হয়। তদন্ত করতে আসলে তাদের সামনেও আমাকে মারতে আসেন। তারা তিনদিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্ত তিন মাস অতিবাহিত হলেও এখনও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর আগেও আমাদের আরেক নারী সহকর্মী তার জন্য এখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। আশরাফ স্যার তার গায়ে হাত দিয়েছিলেন। আমরা এখন আর এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমরা হতাশ।’

এক মিডওয়াফারি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা আর কোনও কথা বলতেই চাই না। কারণ কোনও প্রতিকার পাই না।’

ওই প্রতিষ্ঠানের সাবেক সহকারী আরেক নারী বলেন, ‘তার চরিত্র খুবই খারাপ। আমার সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করতেন। সরাসরি আমাকে প্রস্তাব দেননি। কিন্তু আকার ইঙ্গিতে প্রস্তাব দিতেন। আমার বদলি হয়ে যাওয়ায় বেঁচে যাই। কর্মক্ষেত্রে একজন নারীকে এভাবে হয়রানি কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা প্রতিবাদ করেই বা কি করবো। প্রতিকার পাই না। তাছাড়া তিনি খুব প্রভাবশালী।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ডা. আশরাফ সিদ্দিকী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তাই আমি কোন মন্তব্য করতে পারছি না।’

live pharmacy
umchltd