মৃত্যুর ৩০ বছর পরও ভক্ত হৃদয়ে অষ্টাদশী দিব্যা ভারতী
দিব্যা ভারতী, মৃত্যু ৩০ বছর পরও ভক্ত হৃদয়ে এখনও সেই অষ্টাদশী। বলিউড আকাশের এই তারা মাত্র তিন বছরের অভিনয় জীবনেই উঠেছিলেন জনপ্রিয়তা আর পরিচিতির শীর্ষে।
নব্বই দশকের সেই দিনগুলোতে ভিউকার্ড ও পোস্টারে একটা মুখই ভেসে বেড়াতো, সেটা বলিউড অভিনেত্রী দিব্যা ভারতী। কিন্তু অভিনয় জীবনের বছর তিনেক যেতে না যেতেই দিব্যা ভারতী এক দীর্ঘশ্বাসের নাম হয়ে গেলো। প্রশ্ন থেকেই যায়- দিব্যা কি অভিমানে ঝরে যাওয়া ফুল? নাকি তার জনপ্রিয়তা আর পরিচিতির শীর্ষে উঠাই কাল হলো?
দিব্যার জন্ম ১৯৭৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। বেঁচে থাকলে আজ তাঁর ৫০ পূর্ণ হতো। মাত্র তিন বছরের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার রেখে ১৯৯৩ সালের ৫ এপ্রিল ১৯ বছর বয়সে অকালেই চলে গিয়েছিলেন দিব্যা।

নব্বই দশকের ভিসিআর আর পোস্টারের সে যুগ থেকে এসেছে অ্যান্ড্রয়েড-আইফোনের যুগ; টিকটক, লাইকির যুগ। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম এখন তারকাদেরও বড় ‘ঠিকানা’। এই যুগে দিব্যা নেই। তবে আজ সকাল থেকে ফেসবুক, টুইটারে দিব্যাকে দেখা যাচ্ছে। সেই মন ভুলানো হাসিতে।
দিব্যা ভারতীর মৃত্যু নিয়ে বলিউডের অন্দরমহলে এখনও অনেক গল্প শোনা যায়। অনেকের মতে, এটা ছিল ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে খুন। কেউ কেউ মনে করেন, আত্মহত্যা করেছিলেন এই অভিনেত্রী। এই তর্ক চলছে বছরের পর বছর।
বাবা ওমপ্রকাশ ভারতী ছিলেন জীবনবিমার কর্মী। মা মিতা ভারতী গৃহিণী। ছোট ভাই কুনাল এবং সৎবোন পুনমের সঙ্গে মুম্বাইয়ে বেড়ে ওঠা দিব্যার। হিন্দি, মারাঠি আর ইংরেজি ভাষায় ছিলো স্বাচ্ছন্দ্য। পড়তেন মানেকজি কুপার হাইস্কুলে। অভিনয়ে নিয়মিত হওয়ার পর, নবম শ্রেণির পরে আর পড়াশোনা করেননি তিনি।
১৯৮৮ সালে ‘গুনাহো কা দেবতা’ ছবিতে দিব্যার অভিনয়ের কথা হয়। শেষ অবধি বাদ পড়েন তিনি। কীর্তি কুমার তাঁকে বেছে নিয়েছিলেন ‘রাধা কা সংগম’ ছবির জন্য। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেই সুযোগও চলে যায় জুহি চাওলার কাছে।
এতে হতাশায় চলচ্চিত্রের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন দিব্যা। কিছুটা অনিচ্ছায় শুরু করেন তেলুগু ছবি ‘বব্বিলি রাজা’-এর শুটিং। ১৯৯০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বব্বিলি রাজা’ এখন পর্যন্ত সফল তেলেগু ছবিরগুলোর অন্যতম একটি। প্রথম ছবিতেই আকাশছোঁয়া সাফল্যের পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি দিব্যাকে। প্রথম দুই বছর তেলেগু ও তামিল ছবিতে অভিনয়ের পরে হিন্দি ছবির জগতে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৯১ সাল থেকে। ১৯৯২ সালটি ছিল হিন্দি ছবিতে দিব্যা ভারতীর বছর।

ওই এক বছরে দিব্যা অভিনীত ১২টি ছবি মুক্তি পায়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে সময় দিব্যা ভারতীর পর্দায় উপস্থিতি এতটাই আবেদনময় ছিল দর্শকের কাছে যে এই অষ্টাদশী নায়িকাকে দিয়ে ছবি স্বাক্ষর করাতে প্রযোজকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল।
শোনা যায়, ১৯৯২ সালেই দিব্যা ভারতীর সঙ্গে পরিচয় হয় প্রযোজক সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার। ভারাসোভার তুলসী অ্যাপার্টমেন্টে নাদিয়াদওয়ালাদের ফ্ল্যাটেই গোপনে বিয়ে করেন দু'জনে। ৩০ বছর কেটে গেছে; অথচ আজও সাজিদের পরিবারের একজন হয়েই যেন আছেন দিব্যা ভারতী। দিব্যার শেষ ব্যবহৃত পারফিউম, তাঁর চুলের যত্নআত্তির দ্রব্যসামগ্রী এখনো যত্ন করে রেখেছেন সাজিদ। নায়িকা বিবাহিত হলে দর্শকের কাছে তাঁর আবেদন কমে যায়- এমন ধারণা থেকে বিয়ের বিষয়টি একেবারেই গোপন রাখা হয়। কিন্তু ১০ মে দিব্যা-সাজিদের প্রথম বিবাহবার্ষিকীর এক মাস আগেই চলে গেলেন দিব্যা। কয়েক বছর আগে সাজিদেরই পরের স্ত্রী ওয়ার্দা নাদিয়াদওয়ালা ভারতীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দিব্যা আমাদের জীবনের একটি অংশ। সাজিদ এখনো ভোলেনি তাকে।’ শুধু কি তা-ই, ওয়ার্দার সঙ্গে সাজিদের প্রথম সাক্ষাতের বিষয়টিও কাকতালীয়ভাবে দিব্যাকে কেন্দ্র করে।
ওয়ার্দা বলেন, ‘হ্যাঁ, বিস্ময়করভাবে এটাই সত্য যে আমাদের দু'জনের প্রথম দেখা হওয়ার তিনিই ছিলেন মাধ্যম। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে সাজিদের একটি সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েই পরিচয় হয়েছিল। অবশ্য সাজিদ, দিব্যার বাবা, আমার শ্বশুর আমাকে বলতেন, আমি নাকি দেখতে একেবারেই দিব্যার মতো, একই ব্যবহার, একই আচরণ।’
এমনকি দিব্যার বাবা ওয়ার্দাকে ডাকতেন মেয়ে হিসেবেই। ওয়ার্দা বলেন, ‘তাঁর জায়গায় নিজেকে দেখার কোনো অধিকার আমার নেই। আমি আমার নিজের জায়গা তৈরি করেছি। তাঁর স্মৃতি সব সময়ই অসম্ভব সুন্দর। দিব্যা আমাদের জীবনেরই অংশ।’ দিব্যা কতখানি সাজিদের পরিবারে স্থান করে নিয়েছেন, তারও উদাহরণ দিলেন ওয়ার্দা। তাঁর কথা, ‘আমার ছেলেমেয়েরা যখন তাঁর ছবি দেখে, তখন তারা তাঁকে বলে, “আমাদের বড় মা।”’
ছয়টি অসমাপ্ত সিনেমা
দিব্যা ভারতীর মৃত্যুর সময় পাঁচ থেকে ছয়টি ছবি অসমাপ্ত ছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযোজকদের নতুন নায়িকাদের নিয়ে নতুন করে শুটিং করে ছবি শেষ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ‘লাডলা’, যা নতুন করে শুটিং করা হয় শ্রীদেবীকে নিয়ে। অসমাপ্ত ছবিগুলোর তালিকায় রয়েছে আরও কিছু উল্লেখযোগ্য ছবি—‘মোহরা’, ‘কর্তব্য’, ‘বিজয়পথ’, ‘দিলওয়ালে’ ও ‘আন্দোলন’। আরও কয়েকটি বড় ব্যানারের ছবির কাজও বন্ধ হয়ে যায়, যেগুলোয় অভিনয়শিল্পী চূড়ান্ত ছিল। যেমন অক্ষয় কুমারের সঙ্গে ‘পরিণাম’, সালমান খানের সঙ্গে ‘দো কদম’, ঋষি কাপুরের সঙ্গে ‘কন্যাদান’, সানি দেওলের সঙ্গে ‘বজরঙ্গ’ ও জ্যাকি শ্রফের সঙ্গে ‘চল পে চল’।
দিব্যার মৃত্যুর ঠিক আগেই শুটিং শেষ হয়েছিল ‘রং’ ও ‘শতরঞ্জ’ ছবির। মৃত্যুর পরই মুক্তি পায় দুটি ছবি। বলিউড বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, মাত্র তিন বছরে যে অভিনেত্রী সাফল্যের এই উচ্চতায় উঠতে পারেন, বেঁচে থাকলে হয়তো আজকের দিনে তিনি মাধুরী অথবা শ্রীদেবীর মতোই হয়ে উঠতেন বলিউডের আরেক কিংবদন্তি নায়িকা।
চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মতে, দিব্যার অকাল মৃত্যু না হলে শ্রীদেবী, জুহি ও মাধুরীর হিসাব-নিকাশটা অন্যরকম হতো।
